‘হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন’ বাতিল চায় পুলিশ

‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন- ২০১৩’ বাতিল চান পুলিশ সদস্যরা।এ আইনের কারণে অনেকেই পুলিশের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়েরের সুযোগ পাচ্ছে বলেও দাবি করেন তারা। পুলিশ কর্মকর্তাদের এমন দাবির জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বেসরকারি বিল হিসেবে সংসদে এ আইন পাশ হয়েছে। তাই এ মুহূর্তে আইনটি বাতিল করা যাবে না। তবে কেউ যদি মিথ্যা মামলা দায়ের করে, সেক্ষেত্রে তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।’

পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধন শেষে সোমবার দুপুরে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের শহীদ এসআই সিরু মিয়া মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত কল্যাণ প্যারেডে (দরবার), পুলিশ সদস্যরা এ আইন বাতিল ছাড়াও তাদের বিভিন্ন সমস্যা ও দাবি তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। পুলিশের সব ধরনের সমস্যা ও দাবির বিষয়ে অবহিত আছেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কোনও দাবি জানাতে হবে না। পর্যায়ক্রমে পুলিশের সব সমস্যার সমাধান করা হবে।’

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. তানভীর সালেহীন ইমন প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, ‘‘আপনার সাহসী নির্দেশনায় পুলিশ জঙ্গিবাদের মুলোৎপাটনে সক্ষম হয়েছে। তাই জঙ্গিবাদ নির্মূলে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের রোল মডেল। আপনি অবগত আছেন, পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন কিংবা মৃত্যুর অভিযোগে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করার বিধান রেখে, একটি বেসরকারি বিলের মাধ্যমে ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন -২০১৩’ নামে একটি আইন করা হয়েছে।আইনটিতে নির্যাতনের সংজ্ঞায় মানসিক কস্টকে নির্যাতন বলা হলেও তা নির্ণয়ে কোনও মানদণ্ড না থাকায়, যে কেউ এ আইনে পুলিশের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করার সুযোগ পাচ্ছে।’’

তানভীর সালেহীন আরও বলেন,‘সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এক রায়ে পুলিশের বিরুদ্ধে এ আইনের অধীনে তদন্তকারী কর্মকর্তা, অফিসার ইনচার্জ বা কমান্ডিং অফিসারের বিরুদ্ধে সুয়োমোটো মামলা নেওয়ার জন্য বিজ্ঞ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এ আইনে একাধিক থানার ওসিসহ পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা রুজু হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধিসহ দেশে প্রচলিত অন্যান্য আইন যেখানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের দায়িত্ব পালনে সুরক্ষা প্রদান করেছে, সেখানে এ আইন তার অধিকারকে খর্ব করেছে।’

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘মানসিক নির্যাতনের অজুহাতে যদি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করার সুযোগ থাকে, তবে তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পুলিশ নিরুৎসাহিত হবে। ফলে মামলার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে পুলিশের প্রচেষ্টায় ভাটা পড়বে। এছাড়া বিদ্যমান আইনটি বজায় থাকলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা তাদের কর্মস্পৃহা হারাবে। ফলে রাষ্ট্রীয় ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।’

নারী কনস্টেবল খায়রুন্নাহার পোশাক সমস্যা নিয়ে কথা বলেন। তার বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার মনে হয়, দুই সেট কাপড়ে কখনও চলতে পারে না, এটা ঠিক।’ তাৎক্ষণিকভাবে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র সচিবকে এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমিও চাই আমার পুলিশ যখন ডিউটি করবে, স্মার্টলি দায়িত্ব পালন করবে। সেভাবেই সে চলবে। নিশ্চয়ই নোংরা কাপড় পড়ে সে ডিউটি করবে না।’

পুলিশ সপ্তাহে কেক কাটছেন প্রধানমন্ত্রী

এছাড়াও পুলিশের একজন সার্জেন্ট, একজন ইন্সপেক্টর, একজন এএসপি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের বিভিন্ন সমস্যা ও দাবি তুলে ধরেন। চাকরির ক্ষেত্রে ১০ ভাগ পোষ্য কোটাসহ থানাগুলোতে আবাসন সমস্যা, ঝুঁকি ভাতা, পোশাক-পরিচ্ছদসহ বিভিন্ন সমস্যা ও দাবি তুলে ধরেন তারা। আইজিপি এ কে এম শহীদুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ পুলিশের প্রথম এ কল্যাণ প্যারেডে (দরবার) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ছাড়াও বেশ ক’জন মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাগণ এবং পুলিশ ও র‌্যাবের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, ‘জাতির পিতার স্বপ্নই হচ্ছে আমার স্বপ্ন। যে জাতির জন্য আমার পিতা তার পুরো জীবন উৎসর্গ করেছেন, কষ্ট স্বীকার করেছেন, আর পরিবারের সদস্য হিসেবে আমাদের যে ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে, তাই এদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতেই হবে।’ তিনি বলেন, ‘১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর আমরা দেখেছি, পুলিশের বাজেট মাত্র ৩৬০ বা ৪০০ কোটি টাকা। আমরা একধাপে ওই বছরেই সেটা দ্বিগুণ করে দেই।’

প্রধানমন্ত্রী পুলিশ কল্যাণ প্যারেডে উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে আরও বলেন, ‘শ্রেণিবিন্যাস আর থাকবে না। সবাই মর্যাদা নিয়ে থাকবে। আমাদের জনসংখ্যা বেড়েছে। সেটা বিবেচনা করেই আমরা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট করেছি। টুরিস্ট পুলিশ করেছি। তাদের জন্য বিশেষায়িত ট্রেনিং দরকার। যানবাহনের প্রয়োজন। এগুলো আমাদের মাথায় আছে। সেভাবেই আমরা কাজ করছি। স্পেশাল প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন, নৌপুলিশ আমরা করেছি। পর্যায়ক্রমে আমরা সব সুবিধা নিশ্চিত করবো। আবাসন সমস্যা সমাধানে স্টাফ কোয়ার্টার, ডরমেটরি ও ব্যারাক তৈরি করা হবে বলেও জানান তিনি।