চিকিৎসা ব্যবস্থায় দুর্বৃত্তায়ন বন্ধে আইন নয় কেন?

মো. জাহিদ আনোয়ার: বাংলাদেশে অনেক স্বনামধন্য চিকিৎসক আছেন যারা শুধু দেশে নয় বিদেশেও সমানভাবে জনপ্রিয়। দেশে এ ধরনের চিকিৎসকের সংখ্যা একেবারে কম নয়। বিদেশে গিয়েও তাদের প্রশংসা শোনা যায়। তখন স্বাধীন বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে গর্বে বুক ভরে যায়। মনে হয় স্বাধীনতার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষদের রক্তদান বৃথা যায়নি।

এ বিষয়ে দু’একজন চিকিৎসকের নাম না করলেই নয়। এর মধ্যে একজন হলেন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যায়ের (বিএসএমএমইউ) একটি অনুষদের ডিন। অন্যজন হলেন অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত। সর্বশেষ তিনি বিএসএমএমইউ এর উপাচার্যের দায়িত্ব পালন শেষে চাকরি হতে অবসর গ্রহণ করেন।

ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ ধানমন্ডির ল্যাবএইড হাসপাতালের পেছনে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখেন। চিকিৎসক হিসেবে সর্বোচ্চ যশ খ্যাতি পেলেও এখনও তার ফি মাত্র তিনশত টাকা। তাকে দেখানোর জন্য উন্মুখ হয়ে থাকেন রোগীরা। তার প্রতি রোগীদের আস্থা ও বিশ্বাস এতটাই যে রোগীকে তা মানসিকভাবে অনেকটা সুস্থ করে তোলে। তিনি অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান বলে রোগীদের কাছ থেকে কোন অভিযোগ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত। নাক, কান ও গলা বিশেষঙ্গ। তিনি রাজধানীর গ্রিণ রোডের নামী দামী হাসপাতালে রোগী দেখেন। চিকিৎসক হিসেবে তারও রয়েছে সর্বোচ্চ খ্যাতি। তিনিও ফি নিতেন তিনশত টাকা। হালে সামান্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। অথচ তাদের সহকর্মী বা ছাত্রদের ফি হাজার টাকা থেকে এক হাজার পাঁচশত টাকা পর্যন্ত।

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত স্বল্পভাষী হলেও রোগীর সাথে প্রয়োজনীয় কথা বলেন। তার কথায় রোগীরা আস্থা ও বিশ্বাস পায়। তিনিও অপ্রয়োজনীয় কোন পরীক্ষা নীরিক্ষা করান বলে শোনা যায়নি। রাজধানীর নামী-দামী হাসপাতাল গুলোতে দেখা যায়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ফি সর্বোচ্চ ১৫ শত টাকা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে। ডা. আব্দুল্লাহ এর মতো দেশ-বিদেশে স্বনামধন্য চিকিৎসক যেখানে ৩০০ টাকা ফি নেন সেখানে অন্যান্য চিকিৎসকের ফি ৮০০ থেকে এক হাজার পাঁচশত টাকা! চিকিৎসকের ফি নিয়ে সাধারণ মানুষরা আছেন মহাবিপদে, চলছে ফিস বাণিজ্য।

অধিকাংশ রোগীর অভিযোগ, প্রয়োজন না থাকলেও নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা করানো হচ্ছে। ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোর পরীক্ষা নিরীক্ষা খরচও লাগামহীন। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা নিরীক্ষা হতে ২০-৪০ শতাংশ কমিশন পান বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এ জন্যই অপ্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক করানো হয়। প্রয়োজনহীন পরীক্ষা নিরীক্ষা বন্ধ করা হলে চিকিৎসা ব্যয়ও নাগালের মধ্যে চলে আসবে। এক কথায় চিকিৎসার খরচ চালাতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। যা দিনদিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

চিকিৎসকের ফি এবং পরীক্ষা নিরীক্ষার লাগামহীন ও ব্যয়বহুল খরচ নিয়ে সাধারণ মানুষ জিম্মি। চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে চলছে এক প্রকার দুর্বৃত্তায়ন। এ অবস্থা বেশিদিন চলতে পারে না। এর থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। এজন্য চিকিৎসকের ফিস নির্ধারণ এবং চিকিৎসা খরচও নাগালের মধ্যে রাখতে আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

শোনা যাচ্ছে চিকিৎসকদের ফিস বাণিজ্যের লাগাম টানতে আইন করতে যাচ্ছে সরকার। এ আইনে অফিস চলাকালে চিকিৎসকদের প্রাইভেট বা ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখা বন্ধ করা, চেম্বারের সামনে সরকার নির্ধারিত ফি টাঙিয়ে রাখা এবং ছুটির দিনে জেলার বাইরে গিয়ে রোগী দেখা বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা থাকবে। আশা করা যায়, দেরিতে হলেও সরকারের সময়োপযোগী এ সিদ্ধান্তে চিকিৎকদের ফিস বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব হবে।

দেশের বেসরকারি ক্লিনিক ও প্রাইভেট হাসপাতাল গুলোতে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য সাধারণ মানুষকে উচ্চমূল্য দিতে হচ্ছে। সেবা প্রদানের জায়গা থেকে অধিকাংশ বেসরকারি ক্লিনিক ও প্রাইভেট হাসপাতাল সমূহের মালিক বাণিজ্যিক মানসিকতা নিয়ে পরিচালনা করছে। হাসপাতাল ক্লিনিক গুলোর মধ্যে চলছে রীতিমতো প্রতিযোগিতা। সাধারণ মানুষকে তাদের কাছে জিম্মি। এ অবস্থা অনন্তকাল চলতে পারে না। এই জিম্মিদশা থেকে মানুষ মুক্তি পেতে চায়। এজন্য চিকিৎসকদের ফি নির্ধারণ সংক্রান্ত আইনের মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষার মূল্য নির্ধারণে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে না পারলে সরকারের জনবান্ধব স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

লেখক: সহকারী পরিচালক (তথ্য ও জনসংযোগ), ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড।