সাংবাদিক ও চিকিৎসক কে মাদক দিয়ে ফাঁসানোর চেস্টা ডিবি’র

মুন্সীগঞ্জে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিককে মাদক দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের এক চিকিৎসককে আটক করলেও পুলিশ তাঁকে ছেড়ে দেয়।

গত রোববার রাত ১০টায় মুন্সীগঞ্জ সদরের নতুনগাঁও এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় এলাকাবাসী ও পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায়, নতুনগাঁও এলাকার অন্ধকারাচ্ছন্ন রাস্তার পাশে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক (অবেদনবিদ) রেজাউল ইসলাম রাসেল ও একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের জেলা প্রতিনিধি মাহমুদুল হাসানের রিকশার গতিরোধ করে ডিবি পুলিশ। তল্লাশির নামে তারা মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের পাঁয়তারা করে। একপর্যায়ে সাংবাদিক ও চিকিৎসক নিজেদের পরিচয় দেন। তখন ডিবি পুলিশের সদস্যরা তাঁদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন।

পরে ডিবি পুলিশের সদস্যরা চিকিৎসক ও সাংবাদিককে মাদক (ইয়াবা) সেবনের অভিযোগে থানায় হস্তান্তর করেন। একপর্যায়ে জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসনের চাপের মুখে চিকিৎসককে ছেড়ে দিয়ে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মাদক মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠায় পুলিশ।

এ নিয়ে গত রোববার ও সোমবার সদর হাসপাতালের চিকিৎসক রেজাউল ইসলাম রাসেল কিছু বলতে চাননি। আজ মঙ্গলবার বিকেলে তিনি ক্যামেরার সামনে আসতে রাজি হয়ে সাক্ষাৎকার দেন।

রেজাউল ইসলাম রাসেল বলেন, ‘গত রোববার রাতে সদর উপজেলার পঞ্চসার ইউনিয়নের সিপাহীপাড়া এলাকা থেকে অপারেশন শেষ করে খাবার নিয়ে বাসায় ফিরছিলাম। পথে পেট্রলপাম্প এলাকায় সাংবাদিক হাসানের সঙ্গে আমার দেখা হয়। একই রিকশায় আমরা দুজন বাসার উদ্দেশে যেতে থাকি। যাওয়ার পথে নতুনগাঁও এলাকায় অন্ধকার রাস্তায় পুলিশ আমাদের রিকশা থামায়। আমরা রিকশা থেকে নেমে আমাদের নিজস্ব পরিচয় দিয়ে আলোতে তল্লাশি করার কথা জানাই। কিন্তু সিভিল ড্রেস পরা ডিবির উপপরিদর্শক (এসআই) মোর্শেদ ও এএসআই রহিম আমাদের জোরপূর্বক তল্লাশি চালাতে থাকে। একপর্যায়ে আমাদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি এবং হাতাহাতির পর্যায়ে যায়। আমাদের থেকে টাকা দাবি করলে আমরা না দিয়ে প্রতিবাদ জানালে আমাদের থানায় নিয়ে যায় ডিবি পুলিশ। রাতে সিভিল সার্জন মুচলেকা দিয়ে আমাকে নিয়ে যান। সকালে জানতে পারি পুলিশ সাংবাদিক হাসানকে ইয়াবা থাকার মামলা দিয়ে আদালতে পাঠিয়েছে।’

সাংবাদিক হাসানের বোন অ্যাডভোকেট লাকী আক্তার বলেন, ‘আমার ভাইকে মাদক দিয়ে ফাঁসানো হয়েছে। আমার ভাই একাধিক সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। তিনি মুন্সীগঞ্জ যুব রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের সাবেক যুব প্রধান এবং আমার ভাই কোনো মাদকের সঙ্গে কখনোই জড়িত থাকার প্রশ্ন আসে না। পুলিশের বিরুদ্ধে আমার ভাই অনুসন্ধানীমূলক নিউজ করার কারণেই তারা এই রকম করেছে।’

ঘটনার দিন আটক বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘আমি ১৪ মে রোববার শ্রীনগর উপজেলার চাঞ্চল্যকর ধর্ষণ মামলায় পুলিশের গাফিলতি এবং সেতুমন্ত্রীর নিউজ কাভার করে বাসায় ফিরছিলাম। পেট্রল পাম্প এলাকায় রাসেল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয় এবং একই রিকশায় আমরা বাসায় যেতে থাকি। নতুনগাঁও এলাকায় আমাদের রিকশা থামিয়ে জোর পূর্বক তল্লাশি চালায় পুলিশ। আমরা আলোতে এসে তল্লাশি করতে বললে আমাদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। আমাদের থেকে টাকা দাবি করে, টাকা না দিয়ে প্রতিবাদ জানালে এসআই মোর্শেদ ও এএসআই রহিম থানায় নিয়ে যায়।’

যোগাযোগ করা হলে মুন্সীগঞ্জ ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বিসিএস হেলথ ক্যাডারের ওই চিকিৎসক কী পরিমাণ মাদক খেয়ে এসব কথা বলেছে আমারা জানা নেই। ঘটনাস্থলে থাকা এসআই মোর্শেদ ও এএসআই রহিমের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করেছে তা মিথ্যা। চিকিৎসক রাসেলকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কারণ তাঁর কাছ থেকে মাদক পাওয়া যায়নি।’

এএসআই রহিম বলেন, ‘আমরা আইনের লোক। চিকিৎসক রাসেল যে অভিযোগ জানিয়েছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। মাদক পেয়েছি বলেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। চিকিৎসক রাসেল যে অভিযোগ জানাচ্ছেন তার কোনো সত্যতা নেই।’

মুন্সীগঞ্জের সিভিল সার্জন সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘আমার জানা মতে চিকিৎসক রাসেল মাদকের সঙ্গে জড়িত ছিল না। তাঁর বিরুদ্ধে মাদকের একটি অভিযোগ এসেছে। আমরা অভ্যন্তরীণভাবে এটির একটি ব্যবস্থা নেব।’

মুন্সীগঞ্জ যুব রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের সাবেক প্রধান হাসানুল ইসলাম হিমেল জানান, রেডক্রিসেন্ট মানুষকে মাদক থেকে মুক্ত রাখতে সহায়তা করে। হাসান জেলা রেডক্রিসেন্ট ইউনিটের সাবেক যুবক প্রধান। তিনি কখনো মাদক এবং অসামাজিক কাজে ছিল না। তাঁর  বিরুদ্ধে মাদকের যে অভিযোগ আনা হচ্ছে তা বানোয়াট।