ফেরিওয়ালার পুত্র থেকে সেদিনের ধর্ষণের নায়ক

বনানীর রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণের গুরু নাঈম আশরাফ ওরফে হাসান মো. হালিম। আরো অনেক মেয়ের সম্ভ্রমহানি করেছে এই নাঈম। সাফাতের জন্মদিনে ফুর্তি করার জন্য প্রফেশনাল না এমন নারী সঙ্গ চেয়েছিল সে। বন্ধু সাফাতকে সেভাবেই পরামর্শ দিয়েছিল। ৭ই মার্চ থেকেই টার্গেট করা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীকে। টার্গেট অনুসারেই রেইনট্রিতে রুম নেয়া হয়। ওই দুই তরুণী হোটেল কক্ষে আসার আগেও পর্যায়ক্রমে সেখানে কয়েক তরুণীর সঙ্গে কক্ষে অন্তরঙ্গ সময় কাটিয়েছে তারা। এ সময় নাঈম আশরাফ ছাড়াও সাফাতের কয়েক বন্ধুকে হোটেলে ডেকে আনা হয়েছিল। হোটেল কক্ষে বসেই মদ পান করেছিল তারা। নির্যাতিতা এক তরুণী জানিয়েছেন, হোটেল কক্ষে মদের গ্লাস এগিয়ে দিয়েছিল নাঈম আশরাফ। মদ পান করতে অসম্মতি জানালে নাঈম জোর করেই তাদের মদ পান করায়। একপর্যায়ে নাঈমই বলেছিল শুরু করা যাক। তখন দুই তরুণী বাধা দিলে তাদের সঙ্গী বন্ধু চিকিৎসকের গার্লফ্রেন্ডকে গ্যাং র‌্যাপ করা হবে বলে হুমকি দেয়। এমনকি ওই তরুণীর হাত ধরে কাছে টেনে আনে নাঈম। ওই চিকিৎসক তখন কান্নাকাটি করে তার বান্ধবীকে রক্ষা করতে চায়। তখন ওই দুই তরুণীও চিকিৎসকের বান্ধবীকে নির্যাতন না করার অনুরোধ করে। সাফাত এতে রাজি হলেও নাঈম আশরাফ চেয়েছিল পর্যায়ক্রমে তিন তরুণীকে ধর্ষণ করতে। সাফাতের নির্দেশে শাহরিয়ার ওই তরুণীকে অন্য কক্ষে আটকে রাখে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে সাফাত জানিয়েছে তার বন্ধু সাদমান সাকিফই ওই দুই তরুণীকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল ৭ই মার্চ একটি অনুষ্ঠানে। অবশ্য তার আগেই তরুণীদের চিনতো নাঈম আশরাফ।
জন্মদিনের কয়েক দিন আগে গত ২৬শে মার্চ সাফাতের কেনা রেঞ্জ রোভার গাড়িতে লং ড্রাইভে যায় সাফাত আহমেদ ও নাঈম আশরাফ। গাড়িতে বসেই পরিকল্পনা করেছিল দুই তরুণীকে হোটেলে নিয়ে আসার।
নাঈম আশরাফের কয়েক ঘনিষ্ঠজন জানিয়েছেন, এরকম অনেক ঘটনা ঘটিয়েছে নাঈম আশরাফ। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম ইমেকার্সে কাজ করার সুবাধে সহজেই মডেল, অভিনেত্রী, উপস্থাপিকাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলতো। কিন্তু কেউ কোনো অভিযোগ করেননি। যে কারণে তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি। নাঈম আশরাফের নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন এমন একজন মডেল জানিয়েছেন, একই কায়দায় মদ পান করিয়ে তার সঙ্গে অশালীন আচরণ করেছিল নাঈম আশরাফ। ঘটনাটি ঘটেছিল গত বছরের ১০ই মার্চ রাতে। ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে সেদিন চলছিল ‘অরিজিৎ সিং সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা’ শিরোনামের কনসার্ট। ওই কনসার্টে ডেকে এনে গাড়িতে করে কাজের কথা বলেই তাকে বনানীর একটি হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। প্রথমে যেতে না চাইলেও নাঈমের প্রতি বিশ্বাস থাকায় সেখানে গিয়েছিলেন।
নাঈম আশরাফের এক বন্ধু জানিয়েছেন, নাঈম আশরাফ ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ করেন এই সুবাধে তাদের সঙ্গে পরিচয়। তার অতীত সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না তাদের। তবে এ ঘটনার পর তার সম্পর্কে অনেক তথ্য পেয়েছেন তারা। একইভাবে সাফাতের সাবেক স্ত্রী মডেল পিয়াসা বলেছেন, নাঈম আশরাফ একটা ভণ্ড, প্রতারক। সে অনেক মেয়ের সর্বনাশ করেছে। তদন্ত করলে এরকম আরো অনেক তথ্য পাওয়া যাবে।
ভালো পোশাক, পরিচ্ছন্ন চেহারার আড়ালে নাঈম আশরাফ একজন ধূর্ত প্রতারক। প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কৌশলে সম্পর্ক গড়ে ফায়দা হাসিল করে সে। নিজেকে আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকে বিভিন্নস্থানে। এমনকি সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি হিসেবে তার পোস্টার, ব্যানার রয়েছে ওই এলাকায়। সুযোগ পেলেই প্রতিষ্ঠিতদের সঙ্গে সেলফি তুলে ফেসবুকে প্রচারণা চালায় এই প্রতারক। সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার গান্দাইল গ্রামের ফেরিওয়ালা আমজাদ হোসেনের পুত্র হালিম। ছোটবেলা থেকেই নানা ধরনের প্রতারণায় সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠে। এসএসসি পরীক্ষার সময়ই প্রধান শিক্ষকের নাম ব্যবহার করে রাজশাহী বোর্ড থেকে প্রশ্ন এনে ফেঁসে যায় সে। এলাকার ইউপি চেয়ারম্যানের ছেলের নাম নাঈম আশরাফ। ওই নামটি নিজের নাম হিসেবে ব্যবহার করে সে। নিজের পিতা সাধারণ পেশাজীবী হওয়ার  কারণে পিতার নাম পরিচয় গোপন করে ওই চেয়ারম্যানকে নিজের পিতা হিসেবে বিভিন্নস্থানে পরিচয় দিয়ে থাকে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনকে পিতা পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করতো নাঈম। এ বিষয়ে ওই এলাকার গান্দাইল ইউপি চেয়ারম্যান আশরাফুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, হালিম নাম পরিচয় গোপন করে দুটি বিয়ে করেছিল। প্রতারণার বিষয়টি জানার পর দুটি বিয়ে ভেঙ্গে গেছে। স্কুল জীবন থেকেই সে নানা প্রতারণা করছে। প্রতারণাই তার পেশা।