একনজরে ভারী বর্ষনে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকাগুলোর খন্ড চিত্র

গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণের ফলে সৃষ্ট পাহাড় ধসে চট্টগ্রাম বিভাগের তিন জেলায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। রাঙ্গামাটি, চট্টগ্রাম ও বান্দরবানে এই ঘটনায় সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ১৩১ জন নিহত ও আরো শতাধিক লোক আহত হয়েছেন। এর মধ্যে রাঙ্গামাটিতে সেনা কর্মকর্তাসহ ৮৮  জন, চট্টগ্রামে ২৯ জন এবং বান্দরবানে ৬ জন মারা গেছেন। মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ এখনো মাটির নিচে অনেকে চাপা পড়ে আছেন। তাই উদ্ধার তত্পরতা পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত হতাহতের সঠিক সখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। সোমবার মধ্যরাত থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত পাহাড়ধসে প্রাণহানির এসব ঘটনা ঘটে।

গত তিন দিনের ভারী বর্ষণে রাঙ্গামাটিতে স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে মাটি চাপা পড়ে ৪ সেনা সদস্যসহ ৮৮ জন নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আছেন রাঙ্গামাটি সদরে ৪৫ জন, কাউখালীতে ২৩ জন, কাপ্তাইতে ১৬ জন, বিলাইছড়িতে ২ জন এবং জুরাছড়িতে ২ জন।

রাঙ্গামাটি শহরের ভেদভেদী যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ভেদভেদী, মানিকছড়ি, রিজার্ভ বাজার, তবলছড়িসহ কয়েকটি এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা অসংখ্য বসতঘরে পাহাড় ধসে মাটি চাপা পড়ে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। মানিকছড়িতে সেনাবাহিনীর নিহত ৪ জনের নাম পাওয়া গেছে। এরা হলেন মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল হক, ক্যাপ্টেন মোঃ তানভীর সালাম শান্ত, কর্পোরাল মোহাম্মদ আজিজুল হক ও সৈনিক মোঃ শাহিন আলম। এছাড়া এই ঘটনায় নিখোঁজ আছেন সৈনিক মোঃ আজিজুর রহমান। সকালে মানিকছড়িতে প্রকৃতিক দুর্যোগে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে পাহাড় ধসে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মানিকছড়ি সেনা ক্যাম্প থেকে একটি উদ্ধারকারী দল সেখানে গিয়ে মাটি অপসারণের কাজ করছিল। এসময় ধসে পড়া পাহাড়ের আরেকটি অংশ তাদের ওপর আছড়ে পড়ে। এতে উদ্ধারকারী দলের সেনা সদস্যরা ৩০ ফুট নিচে মাটিতে চাপা পড়েন। ঘটনাস্থল থেকে ওই চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। আরেকজন নিখোঁজ রয়েছেন।

রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান হতাহতের এই সংখ্যা জানান। তিনি বলেন, বিভিন্ন উপজেলা থেকে আমরা খবর নেওয়া চেষ্টা চালাচ্ছি সঠিক তথ্য জানার জন্য। প্রতি ক্ষণে ক্ষণে আমাদের কাছে এখনো তথ্য আসছে। পাহাড় ধসের ঘটনায় আহত অর্ধশতাধিক লোক রাঙ্গামাটি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছে। টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কাপ্তাই লেকের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় রাঙ্গামাটি শহরে নিন্মাঞ্চলের বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। রাঙ্গামাটি শহরে ওমদামিয়া হিল, পর্যটন এলাকা, আনন্দ বিহার, পুরাতন হাসপাতাল, রিজার্ভ বাজার, ভেদভেদী, রাঙ্গাপানি ও শিমুলতলীসহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ধসে অসংখ্য কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শহরের রাস্তার বিভিন্ন অংশে মাটি ভেঙে পড়ায় অনেক স্থানে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। একটানা ভারী বর্ষণে রাঙ্গামাটি শহরে গত ৩দিন ধরে বিদ্যুত্ সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে মোবাইল নেটওয়ার্কও। পানি ও বিদ্যুত্ সংকটে মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে।

পাহাড় ধসের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনীসহ স্থানীয়রা উদ্ধার কাজ চালাচ্ছে। তবে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা সকালে পাহাড় ধসের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। রাঙ্গামাটি শহরে ১০টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

কাউখালীতে গত দু’দিন ধরে চলা প্রবল বর্ষণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার পাহাড় ও টিলাগুলো ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। গত সোমবার দিন-রাত অঝোরে ভারী বর্ষণ হতে থাকে যার ফলে পাহাড় ধস ও ঢল হয় হয়। কাউখালী বাজার এলাকা, পোয়াপাড়া, হাতিমারা, কাশখালী, কচুখালী, বেতছড়ি, গিলাছড়ি, জুনুমাছড়া, চম্পাতলী, ঘাগড়া বাজার এলাকা, চৌধুরী পাড়া, নাইল্যাছড়ি, তারাবুনিয়া, মাঝের পাড়া, বেতবুনিয়া,

রাউজান ঘোনাসহ ফটিকছড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার প্রায় পাচঁ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে কমপক্ষে পাঁচ শতাধিক পরিবার।

কাপ্তাইয়ের চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের মিতিংগাছড়িতে সকাল ৮টার সময় প্রথম পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। এসময় এক পরিবারের তিনজন মারা যায়। এরপর  বিভিন্ন স্থানে একের পর এক পাহাড় ধসের খবর আসতে থাকে। কাপ্তাই উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ দিলদার হোসেন বলেন, অতীতে কখনো এরকম পরিস্থিতি কাপ্তাইয়ে ঘটেনি। বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে হতাহতদের উদ্ধার করতে স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লোকজন ছুটে যান। পাহাড় ধসে কাপ্তাই-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, কাপ্তাই-রাঙ্গামাটি সড়ক এবং কাপ্তাই রাঙ্গামাটি নতুন সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কর্ণফুলী নদীতে ফেরি চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়।

চট্টগ্রাম মহানগরীসহ আশেপাশের বিভিন্ন স্থানে মোট ২৯ জন নিহত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে পাহাড় ধসে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলায় ৬ জন এবং রাঙ্গুনিয়ায় ২৩ জন নিহত হয়েছে। চন্দনাইশের যে স্থানটিতে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে, সেটি উপজেলা সদর থেকে দূরে এবং দুর্গম এলাকায় বলে দুপুরের আগে উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।

রাজানগর ইউনিয়ন পরিষদ অফিসসূত্রে জানা গেছে, বগাবিলি বালুখালী এলাকায় সকালে পাহাড় ধসে একই পরিবারের ৪ জন এবং চাক্করঘোনা এলাকায় অপর একটি  পরিবারের আরো ৪ জন নিহত হয়েছে। অপরদিকে উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের মঘাইছড়ি এলাকায় দুইটি স্থানে পৃথক পাহাড় ধসের ঘটনায় নিহত তিন পরিবারের ১৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

অন্যদিকে চন্দনাইশ উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ধোপাছড়ি ইউনিয়নের শামুকছড়ি ও ছনবনিয়ায়  ভারী বর্ষণে পৃথক ২টি পাহাড় ধসে  মাটিচাপা পড়ে শিশুসহ ৪ জন নিহত ও ২ জন গুরুতর আহত হয়। নিহতরা হলো শামুকছড়ি এলাকার একই পরিবারের মেকো ইয়াং খেয়াং (৫০), মেমো  ইয়াং খেয়াং (১৩), কেউছা ইয়াং খেয়াং (১০) এবং ছনবুনিয়া এলাকার আজগর আলীর মেয়ে মাহিয়া (৩)। স্থানীয়রা ঘটনার পর পরই দুইঘন্টাব্যাপী তত্পরতা চালিয়ে মাটিচাপা পড়া লাশ উদ্ধার করে এবং আহতদের  বান্দরবান হাসপাতালে ভর্তি করে।

বান্দরবানে টানা বর্ষণে পাহাড় ধসে একই পরিবারের তিন শিশুসহ ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসময় আহত আরো ১১ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ভোররাতে এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হচ্ছে লেমুঝিড়ির বাসিন্দার সমুন বড়ুয়ার তিন সন্তান শুভ (৮), মিতু (৬) ও লতা (৪), আগা পাড়ায় মা কামরুন নাহার (২৭), মেয়ে সুখিয়া আক্তার (৮) এবং কালাঘাটায় কলেজ ছাত্র রেবা ত্রিপুরা (১৮)। এ ঘটনায় আহত অবস্থায় আরো ১১ জনকে উদ্ধার করে বান্দরবান হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।