আশা জাগানিয়া বাজেট, নাই শুধু আশ্বাস-বিশ্বব্যাঙ্ক

অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে আশা বেশি, আশ্বাস কম আছে বলে মনে করে বিশ্বব্যাঙ্ক  সংস্থাটি বলছে, বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৭.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনসহ বিভিন্ন খাতে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য দেয়া হয়েছে। কিন্তু এসব লক্ষ্য অর্জনে তেমন বড় কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। অনেক লক্ষ্যমাত্রাই আশার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়েছে। বাস্তবতার সঙ্গে অনেক কিছুরই মিল নেই। এছাড়া আগামী মাস থেকে চালু হতে যাওয়া ভ্যাট আইনকে বিনিয়োগবান্ধব বলে মন্তব্য করেছে বিশ্বব্যাংক। গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংকের অফিসে আয়োজিত প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বাজেটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক প্রতিনিধি চিমিয়াও ফান, বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ শেখ তানজিব ইসলাম, অ্যানালিস্ট সাবিহা সুবহা মোহনা ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মেহরিন এ মাহবুব।
স্বাগত বক্তব্যে চিমিয়াও ফান বলেন, বাজেট অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৭.৪ শতাংশ ধরা হয়েছে। বাজেট বাস্তবায়নে বিপুল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জনের বিষয়টি নির্ভর করছে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের ওপর। তার মতে, অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো হলো বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা, রপ্তানি বৃদ্ধি, যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখা।
জাহিদ হোসেন বলেন, বিশাল আশার ভিত্তিতে বাজেটে লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। আবার বাজেটে খরচের দিক থেকেও কোনো চমক নেই। এছাড়া সংস্কারের জন্য আগামী অর্থবছরে বড় কোনো পদক্ষেপ নেই। তিনি বলেন, বাজারে চালের দাম বাড়ছে। সঠিক সময়ে চাল আমদানি করে বাজারে স্থিতিশীল রাখা প্রয়োজন। এজন্য শুল্ক-কর কমানো উচিত। তিনি বলেন, সীমান্তের ওপারে চালবোঝাই ট্রাক পৌঁছে গেছে। কিন্তু দেশে ঢুকছে না। কারণ, বেশি শুল্ক দিতে হবে। শুল্ক কমালে দেশে আসবে।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে ৫টি চ্যালেঞ্জ রয়েছে উল্লেখ করে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাজেট বাস্তবায়নে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং সেক্টরে সুশাসন ও তদারকি বাড়ানো, খেলাপি ঋণের ঝুঁকি কমিয়ে আনা, বিদ্যুতের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করা। এছাড়া সঞ্চয়পত্রে মাত্রাতিরিক্ত সুদ গুনতে হচ্ছে সরকারকে। এ অবস্থায় সঞ্চয়পত্রের সুদের হার সমন্বয় করা দরকার। মুদ্রা বিনিময় হারকে তার বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে দিতে হবে। একই সঙ্গে চালের মূল্য নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, রেমিট্যান্স খাতেও তেমন সুখবর নেই। এখন ১৪ শতাংশ নেতিবাক প্রভাব এ খাতে রয়েছে। বাজেট সংস্কারে স্বীকৃতি আছে। কিন্তু পদক্ষেপ নেই।
পর্যালোচনায় ড. জাহিদ বলেন, নতুন ভ্যাট আইন পুরাতন ভ্যাট আইনের তুলনায় ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব এবং অনলাইনভিত্তিক হওয়ায় হয়রানিও কমে আসবে। সরকারের পক্ষ থেকে নতুন ভ্যাট আইন ও পুরাতন আইনের মধ্যকার তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এক প্রশ্নের উত্তরে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, নতুন ভ্যাট আইন নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর আঘাত করবে না। কারণ, তারা যেসব পণ্য ব্যবহার করে, তার অধিকাংশই ভ্যাটের আওতামুক্ত। এছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষেরা যেসব জায়গা থেকে কেনাকাটা করে, সেসব প্রতিষ্ঠানের টার্নওভার কম হওয়ায় ভ্যাটের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে তাদের ক্রয়ক্ষমতার ওপর নেতিবাচ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই।
জাহিদ হোসেন বলেন, রাজস্ব আদায় নির্ভর করছে ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের ওপর। তারপর আয়করের ওপর। আয়কর খাতে সংস্কার নেই। ফলে আদায়ের প্রত্যাশা কম। আমদানি শুল্কের ক্ষেত্রে সরলীকরণ করা হয়নি। রাজস্ব আদায়টি মিশ্র ঝুড়ি বলা যায়। তিনি বলেন, ব্যয়ের ৮০ ভাগ বরাদ্দ যাবে সুদ, বেতন, ভর্তুকি ও ট্রান্সফার খাতে। আবার সুদ খাতে যা ব্যয় হবে তার ৪৭.৫ শতাংশ যাবে সঞ্চয়পত্রের সুদ খাতে। তিনি জানান, চালের দাম বৃদ্ধির কারণে খাদ্যে ভর্তুকি বাড়বে। কিন্তু অন্য খাতে বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে যে ভর্তুকি দিচ্ছি তা কতদিন চলবে? পিডিবির লোকসান রয়েই গেছে। বিদ্যুত খাতের অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতার উন্নয়ন না হলে এই ভর্তুকি কমানো যাবে না।
আরেক এক প্রশ্নের জবাবে জাহিদ হোসেন বলেন, নতুন ভ্যাট আইনের কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর বড় ধরনের কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে দাম বাড়বে, এমন অপপ্রচারে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। সক্ষমতার অজুহাতে ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন ৫ বছর পিছিয়েছে সরকার। আর পেছানো ঠিক হবে না। বাস্তবায়ন শুরু হলে সক্ষমতাও গড়ে উঠবে। তার মতে, আবগারি শুল্ক বাড়ানো ব্যাংকিং খাতে সঠিক সংকেত দিচ্ছে না। যখন আমরা আর্থিক ব্যবস্থার গভীরতা ও সম্পৃক্ততা বাড়াতে চাচ্ছি, তখন এ ধরনের ভুল সংকেত দেয়া হচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্ন করেন তিনি।
জাহিদ হোসেন বলেন, বাজেটে প্রবৃদ্ধি, সীমিত ঘাটতি, বৈদেশিক সহায়তা, রাজস্ব আদায়সহ যেসব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা হয়তো অর্জনের আশা করতেই পারি। কিন্তু এটা কিসের ভিত্তিতে হবে সেটা বাজেটে দেখছি না। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে যে ধরনের আর্থিক খাতসহ অন্য সেক্টরে যেসব সংস্কারের প্রয়োজন ছিল তা দেখছি না। এজন্য এ বাজেটকে সংক্ষিপ্ত আশ্বাসের বাজেট বলছে বিশ্বব্যাংক।
জাহিদ হোসেন বলেন, গত ৩ বছর ধরে প্রথম পর্যায়ে এডিপি বাস্তবায়ন ধীরগতির। তবে পরবর্তী পর্যায়ে এটা দ্রুতগতিতে বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি বলেন, বিশ্বের অন্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যয় অনেক বেশি। এর প্রধান কারণ টেন্ডারিংয়ে প্রতিযোগিতা অনেক কম। তাই সরকারের উচিত ৮০ শতাংশ ই-টেন্ডারিং করা। এটা করতে পারলে টেন্ডারিংয়ে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন খরচ কমবে। তিনি বলেন, এডিপি বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি দেখছি না। বিশ্বব্যাংক বলছে, বাজেটে কাঠামোগত সংস্কারের আলোচনা কম। বিশেষ করে আর্থিক খাত সংস্কারের আলোচনা আসেনি। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার কমিয়ে আনার কোনো কথা বলা হয়নি।
বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি চিমিয়াও ফান বলেন, ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে কষ্ট ভোগ করতে হবে সরকারকে। ৩১.৮ শতাংশ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হবে। সরকারকে কাঠামোগত সংস্কার ও বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।