লাইলাতুল কদর ও জুমাতুল বিদা

২২ জুন, ২০১৭ ইং
আজ ২৬ রমজান দিবাগত রাত্রিটি সারা মুসলিম বিশ্বে লাইলাতুল কদর হিসাবে উদযাপিত হয়। এই রাত্রি মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক। কেননা অন্যান্য নবী-রাসূলের উম্মতরা দীর্ঘ জীবনে যত পুণ্য অর্জন অধিক সওয়াবের অধিকারী হইয়া থাকেন। এখানে লাইলাতুন অর্থ রাত্রি আর কদর অর্থ মর্যাদা বা সম্মান। অর্থাত্ লাইলাতুল কদর মানে মর্যাদাবান বা মহিমান্বিত রাত্রি। এই রাত্রি মহিমান্বিত হইবার প্রধান কারণ হইল এই রাত্রে জিল করা হইয়াছে সর্বশেষ আসমানি কিতাব কোরআনুল কারীম। এই রাত্রে সম্পূর্ণ কোরআন আল্লাহতাআলা ‘লাওহে মাহফুজ’ হইতে বাইতুল-ইজ্জাতে (মহামহিম ভবনে) অবতীর্ণ করেন। ইহার অবস্থান পৃথিবীর নিকটবর্তী আকাশে। অতঃপর বিভিন্ন পরিস্থিতির ভিত্তিতে আল-কোরআনের বিভিন্ন অংশ ২৩ বছর ধরিয়া আল্লাহতাআলা নাজিল করেন। দ্বিতীয়ত পবিত্র কোরআনে ‘কদর’ নামে একটি স্বতন্ত্র সূরাই নাজিল করা হইয়াছে যেখানে এই রাত্রির বিস্তারিত বিবরণ রহিয়াছে। বলা হইয়াছে, লাইলাতুল কদরি খয়রুম মিন আলফি শাহর। অর্থাত্ লাইলাতুল কদর সহস্র মাস হইতে উত্তম। অন্য কোনো রাত্রি সম্পর্কে এমন গৌরবজনক কোনো কথা বলা হয় নাই।
লাইলাতুল কদরে ইবাদত-বন্দেগীর কল্যাণে একজন নগণ্য মানুষও আল্লাহর দৃষ্টিতে মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হইতে পারেন। এখানে বিস্ময়কর ব্যাপার হইল, এই রাত্রির ইবাদত কত হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম তাহা স্পষ্ট করিয়া বলা হয় নাই। তাহার পরও যদি কমপক্ষে এক হাজার মাস ধরা হয়, তাহা হইলে হিসাবে তাহা হয় ৮৩ বত্সর চার মাস। একজন সাধারণ মুসলমান গড়ে দৈনিক সোয়া একঘণ্টা ইবাদতে কাটাইলে আশি বত্সরের জীবদ্দশায় সর্বসাকুল্যে তিনি এক হইতে দেড় বত্সর কাল ইবাদতে কাটাইতে পারেন। কিন্তু এই রাত্রির ইবাদতের দ্বারা নিরবচ্ছিন্নভাবে ৮৩ বত্সর চার মাসের ইবাদতের সওয়াব লাভ করা যাইবে যাহা একটি সুবর্ণ সুযোগ ও আল্লাহর রহমতই বটে। এইজন্য বুখারি ও মুসলিম শরীফের একটি হাদিস অনুযায়ী যে ব্যক্তি সওয়াবের নিয়তে লাইলাতুল কদরে দণ্ডায়মান থাকে তথা ইবাদত করে, আল্লাহ তাহার অতীতের সমস্ত গুনাহ-খাতা মাফ করিয়া দেন। তাহা ছাড়া হযরত ইবনে আব্বাসের (রা) বর্ণনা মতে, শবে বরাতে আল্লাহ এক বত্সরের জন্য বান্দার রুজি-রিজিক, হায়াত-মাউত ও অন্যান্য তকদীরী ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, আর লাইলাতুল কদরে সেই সকল সিদ্ধান্তের প্রয়োগ ও রুজি-রিজিক প্রভৃতি সরবরাহের দায়িত্ব আল্লাহ সংশ্লিষ্ট ফিরিশতাদের হাতে তুলিয়া দেন (কুরতুবি)। তাই নফল নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, তাসবিহ-তাহলিল, দরূদ শরীফ পাঠ, দান-সদকা ইত্যাদির মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ এই রাত্রিটি উদযাপন করিয়া থাকেন।
অন্যদিকে কয়েক বত্সর ধরিয়া লাইলাতুল কদর ও জুমাতুল বিদা বলিতে গেলে হাত ধরাধরি করিয়া আসিতেছে। এই বত্সর আগামীকাল শুক্রবারই পালিত হইবে এই দিবসটি। জুমাতুল বিদা অর্থ মাহে রমজানের শেষ জুমা বা শুক্রবার। জুমার দিন দোয়া কবুলের দিন। আর জুমাতুল বিদা হইতেছে সকল জুমার শ্রেষ্ঠ জুমা। তাহা ছাড়া যেহেতু রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস মাহে রমজানের বিদায় অত্যাসন্ন, তাই এই দিনে নিজের পাপরাশি মাফ করিয়া নেওয়ার একটি সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকে। এই দিনটি আবার মুসলিম জাহানে কুদস দিবস হিসাবেও পালিত হয়। সব মিলাইয়া লাইলাতুল কদর ও জুমাতুল বিদা আমাদের সম্মুখে পুণ্যের এক মহা সমারোহ ও গুনাহ মাফের অফুরন্ত সুযোগ আনয়ন করিয়া থাকে। তাই এই অপূর্ব সুযোগের সদ্ব্যবহার করাটাকেই মুমিন-মুসলমানগণ তাহাদের দায়িত্ব জ্ঞান করিয়া থাকেন।