মাছে ভেজাল না দেয়ার আহবান প্রধানমন্ত্রীর

সামান্য মুনাফার লোভে মাছে ভেজাল না দিতে মৎস্য ব্যবসায়ী, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিতে সম্পৃ সর্বনাশ। এই সর্বনাশের পথে যেন কেউ না যায়। বিশেষ করে আমাদের মৎস্য ব্যবসায়ীরা। তিনি বলেন, রপ্তানির ক্ষেত্রে সবসময় আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। যাতে কোনো রকম অভিযোগ যেন আমাদের বিরুদ্ধে না আসে। মাছচাষ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকে আমি অনুরোধ করবো- সামান্য একটু মুনাফার লোভে নিজের ব্যবসাটাও যেমন নষ্ট করবেন না, তেমনি দেশের রপ্তানি বা পণ্যটাও আপনারা নষ্ট করবেন না।
প্রধানমন্ত্রী গতকাল সকালে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০১৭ উদযাপন উপলক্ষে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন। বর্তমানে দেশেও মাছের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ছে। আগে একজন রিকশাওয়ালা যেখানে শুধু চাল কিনতে সক্ষম ছিল, সে এখন একটু মাছও সঙ্গে কিনতে পারে। একজন দিনমজুরের সক্ষমতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। এজন্য চাহিদাও বাড়বে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা যত বাড়বে, আমাদের বাজারও ততটা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। তিনি বলেন, ৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর দেখলাম চিংড়ি রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশ থেকে চিংড়ি নেবে না। কেননা, চিংড়ি মাছের মধ্যে লোহা ঢুকিয়ে দিয়ে ওজন বাড়িয়ে সেটা রপ্তানি করা হয়। এটা যখনই ধরা পড়ে সঙ্গে সঙ্গেই চিংড়ি রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কথা বলে মৎস্য খাতের উন্নয়নের জন্য সেই সময় ৪০ কোটি টাকা এবং একটি কমিটি করে দিই। সেই টাকা দিয়ে প্রত্যেকটি হ্যাচারি উন্নত করা হয়। ধীরে ধীরে মানসম্পন্ন রপ্তানির মধ্য দিয়ে আবার মৎস্য রপ্তানি সচল হয়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী সায়েদুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহমুদুল হাসান খান বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি প্রথমবার ক্ষমতায় এসেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনুরোধ করেছিলাম যেমন আমাদের কৈ মাছ, মাগুর মাছসহ দেশি মাছের ওপর গবেষণার জন্য। আগে দেখতাম তেলাপিয়া ও কার্প জাতীয় মাছ নিয়েই কেবল গবেষণা চলত। কোন মাছটার বাজারে চাহিদাটা বেশি সেটা নিয়েই আমাদের গবেষণা করা, উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং প্রক্রিয়াজাত করে সেটা বিদেশে রপ্তানি করা প্রয়োজন। ১৮ই জুলাই থেকে ২৪শে জুলাই পর্যন্ত এবারের মৎস্য সপ্তাহ উদযাপিত হচ্ছে। মৎস্য সপ্তাহের এবারের প্রতিপাদ্য ‘মাছ চাষে গড়বো দেশ, বদলে দেব বাংলাদেশ।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর জাতির পিতা ১৯৭৩ সালে গণভবনের লেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাছের পোনা ছেড়ে মৎস্য সপ্তাহ উদযাপনের শুভ সূচনা করেন। তিনি পাট, চা, চামড়ার সঙ্গে মাছকেও বাংলাদেশের রপ্তানিপণ্য হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। মৎস্যসম্পদ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বিতীয় প্রধান খাত হবে বলে জাতির পিতা আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি বলেন, আজ দেশের ১ কোটি ৮২ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা মৎস্য সম্পদের সঙ্গে সম্পর্কিত। জিডিপিতে মৎস্যসম্পদের অবদান প্রায় ৪ শতাংশ। প্রাণিজ আমিষের ৬০ ভাগ যোগান দেয় মৎস্য খাত। জাতির পিতার সেই আশাবাদ এখন বাস্তবে পরিণত হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে ১৩ জন মৎস্য চাষি এবং প্রতিষ্ঠানকে মৎস্য খাতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেব স্বর্ণ ও রৌপ্য পদক প্রদান করেন। এদের মধ্যে ৪ জন স্বর্ণ এবং ৯ জন রৌপ্য পদক পেয়েছেন। পদক ও সনদপত্রসহ নগদ ৫০ হাজার এবং ৩০ হাজার টাকার চেকও বিজয়ীদের প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের কৃষিজ আয়ের ২৪ দশমিক ৪১ ভাগ আসে মৎস্য খাত থেকে এবং জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় ৩ দশমিক ৬১ ভাগ। তাছাড়া মাছ প্রাণিজ আমিষের ৬০ ভাগ যোগান দেয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এ খাতের বিশেষ অবদান উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যখনই সরকার গঠন করেছে তখনই দেশের মৎস্য সম্পদ রক্ষা ও উৎপাদন বৃদ্ধির উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। তিনি বলেন, আমরাই দেশে প্রথমবারের মতো ‘জাতীয় মৎস্য নীতি-১৯৯৮’ প্রণয়ন করি। সেসময় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলমহালে সমাজভিত্তিক মাছচাষ ব্যবস্থাপনা, মাছের আবাসস্থল উন্নয়ন, প্লাবনভূমিতে মৎস্য চাষ ও অভয়াশ্রম স্থাপনসহ অবকাঠামো উন্নয়নে ১০৭ কোটি টাকার ২৬টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করি। চট্টগ্রামে পাহাড়ি জলাশয়সহ সারা দেশে মৎস্যচাষ সমপ্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। আমরা ৭৯৯টি জলমহাল মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করি। মৎস্যচাষি, মৎস্যজীবী ও উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিই। ভূমিহীন, বেকার ও প্রান্তিক মৎস্যজীবী ও মৎস্যচাষিদেরকে সহজ শর্তে ঋণ দিই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মৎস্য উৎপাদন ও মৎস্য চাষ সমপ্রসারণ কার্যক্রম বাস্তবায়নে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা মৎস্য অধিদপ্তরকে সম্মানজনক ‘এডওয়ার্ড সওমা’ পুরস্কারে ভূষিত করে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ ও কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা মাছের উৎপাদন ও আহরণ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার টন মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে যা ইতিপূর্বে ছিল ৯ লাখ ৭৪ হাজার টন। ফলে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মৎস্য আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে ৪র্থ স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
তিনি বলেন, যার ফলে-২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত মৎস্য সেক্টরে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রায় ৪১ লাখ লোকের বাড়তি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। মৎস্যচাষি ও মৎস্যজীবীদের আয় ৩০ ভাগেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরকার মাছে ফরমালিনের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিংড়ি এবং মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বাস্তবধর্মী ও সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সাভার, চট্টগ্রাম ও খুলনায় তিনটি সর্বাধুনিক মাননিয়ন্ত্রণ ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। চাষিদের রোগমুক্ত চিংড়ি পোনা সরবরাহের জন্য কক্সবাজার, সাতক্ষীরা ও খুলনায় ৩টি পিসিআর ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কক্সবাজারে আরো ১টি ল্যাব প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য ও বনাঞ্চল রক্ষা, পানি সম্পদের উন্নয়ন ও নদীতে নাব্যতা রক্ষার জন্য তাঁর সরকার ইতিমধ্যে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে মধুমতি, গড়াই, যমুনা, বুড়িগঙ্গা, কুশিয়ারা প্রভৃতি নদীতে নাব্যতা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। মধুমতি ও গড়াই নদী খননের ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। লবণাক্ততা হ্রাস পেয়েছে। রক্ষা পাচ্ছে সুন্দরবনসহ আশপাশের জীববৈচিত্র্য।
মৎস্যজীবীদের উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন কল্যাণমূলক পদক্ষেপের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মৎস্য সম্পদের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় গবেষণা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।
প্রধানমন্ত্রী পরে গণভবনের লেকে মাছের পোনা অবমুক্ত করেন।