জেলা প্রশাসক সম্মেলন শুরু,দুর্নীতি উচ্ছেদ করতে হবে-প্রধানমন্ত্রী

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১২২ ভাগ বেতন বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এখন দেশের জন্য কাজ করতে হবে। দুর্নীতি উচ্ছেদ করতে হবে। মানুষের জন্য আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যেতে হবে। গতকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তাঁর কার্যালয়ে তিন দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশ্যে এসব কথা বলেন। ‘এই বাংলার মাটি থেকে করাপশন উত্খাত করতে হবে। করাপশন আমার বাংলার কৃষক করে না। করাপশন আমার বাংলার মজদুর করে না। করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ। যারা তাদের টাকা দিয়ে লেখাপড়া করেছি’-  জাতির পিতার  এক ভাষণের এই  উদ্ধৃতি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন,  এই করাপশনকে যে করেই হোক দূর করতে হবে। কোন কাজে করাপশন হলে উন্নয়নের ছোঁয়া গ্রামবাংলায় লাগবে না। এজন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি এ ক্ষেত্রে নিজেদেরও কঠোর অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর ঘোষিত ডিজিটালাইজেশন বাস্তবায়নের ফলে করাপশন নিয়ন্ত্রণে আসছে ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হচ্ছে। এখন আর টেন্ডারের বাক্স ছিনতাইয়ের খবর খুব একটা শোনা যায় না। এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। ডিসিদের প্রতি তিনি বলেন, ‘আমরা যে সিদ্ধান্তই নেই, সেটা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের দায়িত্ব আপনাদের ওপরই বর্তায়। আপনাদের আন্তরিকতা, কর্মদক্ষতা, যোগ্যতাই পারে এ দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান পাল্টে দিতে। কাজেই আপনারা সেভাবেই কাজ করবেন।’                শেখ হাসিনা বলেন, আমরা চাই দেশকে এগিয়ে নিতে এবং আমরা বিশ্বাস করি গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতাই একটি দেশকে উন্নত করতে পারে, সেই অভিজ্ঞতা আমরা ইতিমধ্যেই অর্জন করেছি। ’৭৫ থেকে ’৯৬ এ দেশের মানুষ শুধু বঞ্চনারই শিকার হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার যে জনগণের সেবক সেটা তখনই মানুষ উপলব্ধি করতে পেরেছে- যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়এসেছে।প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে অনুষ্ঠিত এই সন্মেলনে আরো বক্তৃতা করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক ও মুখ্য সচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী। মন্ত্রিপরষদ সচিব মোহম্মদ শফিউল আলম অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক মো. আবুল কালাম আজাদ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-সচিবেরা এসময় উপস্থিত ছিলেন।জেলা প্রশাসকদের পক্ষে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক বেগম উন্মে সালমা তানজিয়া, চাঁদপুরের আব্দুস সবুর মন্ডল, যশোরের জেলা প্রশাসক মো. আশরাফ উদ্দিন এবং ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনার জি এম সালেহ উদ্দিন বক্তৃতা করেন। সন্মেলন উপলক্ষে জেলা প্রশাসকদের পক্ষ থেকে ইতিপূর্বে ৩৪৯টি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিভাগীয় কমিশনারের পদটি বেতন স্কেলের ১ নম্বর এবং জেলা প্রশাসক পদধারীদের তৃতীয় গ্রেডে উন্নীতকরণ, নিজেদের মতো করে তথ্য সংগ্রহের জন্য সোর্স মানি এবং ঝুঁকিভাতা প্রবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে।ডিসিদের উদ্দেশ্যে  প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে সবসময় মাথা উঁচু করে যেন চলতে পারি আপনারা সেভাবে কাজ করবেন। আমরা বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করতে চাই এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হবে ইনশাআল্লাহ।শেখ হাসিনা  বলেন, ২ লাখ ৮০ হাজার গৃহহীনের আবাসনের ব্যবস্থা করার লক্ষ্য ও পরিকল্পনা নিয়ে তাঁর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার কাজ করছে। আপনারা গুচ্ছগ্রাম, আদর্শ গ্রাম ও এ ধরণের প্রকল্প করে গৃহহীনদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন মাঠ প্রশাসনের ৬৪ ডিসি এবং ৬ বিভাগীয় কমিশনার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূল পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করার জন্য ডিসিদের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতা দূর করে সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে আরও সতর্কতার সঙ্গে এবং কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস নির্মূলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, গ্রামের মুরুব্বি, নেতৃস্থানীয় ব্যবসায়ী, নারী সংগঠক, আনসার-ভিডিপি, গ্রাম পুলিশ, এনজিও কর্মীসহ সমাজের সবাইকে সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কল্যাণে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সাধারণ মানুষকে সহজে সুবিচার প্রদান ও আদালতে মামলার জট কমাতে গ্রাম আদালতগুলোকে কার্যকর করতে হবে। ভেজাল খাদ্যদ্রব্য বাজারজাতকরণ প্রতিরোধে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টি করে এসব অনৈতিক কর্মকান্ড কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। শিল্পাঞ্চলে শান্তি রক্ষা, পণ্য পরিবহন ও আমদানি-রপ্তানি নির্বিঘ্ন করা এবং পেশিশক্তি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও সন্ত্রাস নির্মূল করতে ব্যবস্থা নিতে হবে। ভোক্তা অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে এবং বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির যে কোন অপচেষ্টা কঠোর হাতে দমন করতে হবে। বিকেলে সন্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা ও প্রাথমিক গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিদ্যুত্ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সচিবদের সঙ্গে ডিসিদের আলোচনা হয়।