২০২১ সালের মধ্যে সকলের জন্য নিরাপদ পানি-প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমাদের উন্নয়ন সহযোগী ১২টি দেশের সহযোগিতায় ১০০ বছর মেয়াদি ‘হান্ড্রেড ইয়ার বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান (বিডিপি)-২১০০’ নামে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত এই পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় সমতল, পাহাড় ও উপকূলীয় এলাকাগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনার আওতায় নেওয়া হয়েছে। এতে একশ বছরে পানির প্রাপ্যতা, তার ব্যবহার এবং প্রতিবেশগত বিষয়সমূহ বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

গতকাল শনিবার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে তিন দিনব্যাপী ‘ওয়াটার সামিট-২০১৭’র উদ্বোধন-কালে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, রাজধানী ঢাকায় নতুন খাল খনন, পুরনো খাল সংস্কার, জলাধার সংরক্ষণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০২১ সাল নাগাদ ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে বিভাগীয় সদরগুলোতে ভূ-উপরিস্থিত নিরাপদ পানি সরবরাহের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এসডিজি’র নির্ধারিত সময়সীমা ২০৩০ সালের আগেই আমরা শতভাগ মানুষকে নিরাপদ পানি সরবরাহ করতে চাই। তবে ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা ২০২১ সালের মধ্যেই সকলের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে পারব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে অর্থাত্ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা। জাতিসংঘের পানি এবং স্যানিটেশন বিষয়ক বিশেষ প্যানেলের সদস্য শেখ হাসিনা বলেন, শিল্পাঞ্চল, বসতিসহ সকল এলাকায় জলাধার সৃষ্টি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং বর্জ্য ও দূষিত পানি নিষ্কাশন করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নাব্য হ্রাস প্রতিরোধে দেশে নদ-নদীতে ড্রেজিং কার্যক্রম চলছে। প্রধানমন্ত্রী নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনায় সরকার গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে বলেন, লবণাক্ত পানিপ্রধান এলাকায় পুকুরের পানি ফিল্টার করে লবণাক্ততা মুক্ত করা হয়েছে, ৭ হাজার পুকুর এবং গভীর কূপ খনন করা হয়েছে ৩২ হাজার ৬০০টি। বর্ষার পানি সংরক্ষণে ৪ হাজার ৭০০টি জলাধার তৈরি করা হয়েছে এবং ২০২১ সালের মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনাসহ সকল বিভাগীয় শহরে ভূ-উপরিস্থ উত্স থেকে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার কার্যক্রম চলছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বন্ধুত্বের তাগিদ থেকে নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনায় বিশ্ব পরিস্থিতির দিকেও আমাদের নজর দিতে হবে। তিনি বলেন, গোটা বিশ্বে এই মুহূর্তে ২৪০ কোটি লোক স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এছাড়া নিরাপদ পানির অভাবে পৃথিবীতে বছরে ১০ লাখ লোক মারা যায়, যাদের অধিকাংশই শিশু। প্রতিদিন গড়ে বিশ্বে এক হাজার শিশু বিশুদ্ধ পানির অভাবে প্রাণ হারায়। মরক্কোর মারাকাসে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনের প্রদত্ত বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে পানি ব্যবস্থাপনায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন বিষয়ে পৃথক ফান্ড গঠনের দাবি জানিয়েছি। বাংলাদেশকে জাতিসংঘ গঠিত নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্যানেলে রাখা হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমি আশা করি, এই সম্মেলনে ডেল্টা সামিটের ওয়ার্কিং সেশন ও বৈঠকগুলোতে বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনা ও পয়ঃনিষ্কাশনের পথে বাধাসমূহ চিহ্নিত হবে এবং এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভবিষ্যত্ কর্মকৌশলও বেরিয়ে আসবে। তিনি বলেন, আমাদের সরকার জনগণের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যেই বিশেষ সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। এমডিজি’র লক্ষ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালের মধ্যে ৮৪ শতাংশ লোকের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করার লক্ষ্য নির্ধারিত ছিল। ২০১৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের ৮৭ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানি পেয়েছেন। বর্তমানে বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে ৯৮ ভাগ মানুষ নিরাপদ পানি পাচ্ছেন। তার সরকার ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহার কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির সংরক্ষণ ও ব্যবহার উপযোগী করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসডিজি-৬ এর নির্দেশনার আগেই আমরা বিশেষ শ্রেণির জনগোষ্ঠী যেমন শিশুদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা বিশেষ এলাকা যেমন লবণাক্ততা বা আর্সেনিকযুক্ত এলাকা, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার জন্য বহুমুখী কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে তৃণমূলের প্রান্তিক জনগণের কাছে নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী রোল মডেল হয়ে উঠেছিল বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

এলজিআরডি ও সমবায় মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক প্রধান সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে শিল্পকলা একাডেমির পরিকল্পনায় শিশুদের সমন্বিত নৃত্যের সঙ্গে উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশিত হয়। এছাড়া অনুষ্ঠানে ‘বেঙ্গল ডেল্টা’ শীর্ষক বাংলাদেশের চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমের ওপর দুটি ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ প্রস্তুত: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, প্রতিনিয়ত আমাদের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়। এ কারণে বাংলাদেশের জনগণ যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। পানি সম্মেলনে অংশ নেওয়া প্রতিনিধিরা গতকাল শনিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্ করতে এলে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের বাংলাদেশে আসার এখনই সর্বোত্তম সময়। আপনারা এখানে বর্ষা দেখে এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে পানি বিষয়ে আপনাদের মূল্যবান মতামত দিতে পারবেন। পানি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের নদী ভাঙন বন্ধের উপায় খুঁজে বের করতে প্রতিনিধিদলকে অনুরোধ করেন।

এসডিজি বাস্তবায়নে ঢাকা পানি সন্মেলন অবদান রাখবে: পানিসম্পদ মন্ত্রী

এদিকে পানি সম্মেলন উপলক্ষে বিকালে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৬ নম্বর লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব এশিয়া ও ডেল্টা কোয়ালিশনভুক্ত অঞ্চলের দেশে কর্মকৌশল খুঁজে বের করতে ঢাকা পানি সম্মেলন বিরাট অবদান রাখবে। সম্মেলনে ২৩টি দেশের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ ৮৩ জন বিদেশি প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করছেন বলে মন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক প্রধান সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ঢাকায় পানি সম্মেলনে নীতি-নির্ধারকগণ এসডিজির ৬নং লক্ষ্যসহ এর সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য লক্ষ্য বাস্তবায়নের দিক-নির্দেশনা খুঁজে পাবেন। এসময় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. জাফর আহম্মদ খান উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে বিকালে হোটেল সোনারগাঁওতে সম্মেলনের অংশ হিসেবে দশম শেরপা পানি বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের এক সভায় ডেল্টা কোয়ালিশনভুক্ত অঞ্চলের ঢাকা ঘোষণা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় নিরাপদ পানি সমস্যা মোকাবিলায় একটি সমন্বিত রোডম্যাপ প্রণয়নের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

প্রসঙ্গত, ঢাকা পানি সম্মেলনের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে- ‘টেকসই উন্নয়নে পানি’। সম্মেলনে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, পানির গুণগতমান, ব্যবহার এবং সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার উপর ৪টি কারিগরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সুপারিশক্রমে আজ রবিবার ‘ঢাকা পানি ঘোষণাপত্র’ গৃহীত হবে।