সাংবাদিকরা অংশগ্রহন মূলক নির্বাচন চায়-ইসি-র সাথে মতবিনিময়কালে

সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করার তাগিদ দিয়েছেন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের পরিবেশ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে তারা বলেছেন, রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য ব্যতীত সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক ঐক্য অত্যন্ত জরুরি। সব দলের আস্থা অর্জনে কমিশনকে পরামর্শ দিয়ে গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা বলেন, বর্তমান কমিশন এখন পরীক্ষামূলক প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। সব রাজনৈতিক দলের আস্থা অর্জনে তাদেরকে আরো অনেক পথ যেতে হবে। কমিশনকে আইনি যে ক্ষমতা দেওয়া আছে তার পূর্ণ প্রয়োগ করতে হবে। রেফারির ভূমিকায় থাকা ইসিতে নির্বাচনী মাঠে ‘লাল কার্ড’   দেখাতে হবে। গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ, আইন সংস্কার, সীমানা নির্ধারণসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতামত নেওয়ার লক্ষ্যে ধারাবাহিক এ সংলাপের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এরই অংশ হিসেবে বুধবার প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে সংলাপে বসে কমিশন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সংলাপে চারজন কমিশনার, ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিব, অতিরিক্ত সচিব, ২৬ জন সাংবাদিক অংশ নেন। সকাল সোয়া ১০টায় সংলাপ শুরু হয়ে তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সংলাপে ৩৮ জন সিনিয়র সাংবাদিককে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ২৬ জন অংশ নিলেও বাকি ১০ জনের কেউ কেউ বিদেশ অবস্থান, কেউ অসুস্থ ও অন্যান্য কারণে সংলাপে অংশ নেননি। যারা অংশগ্রহণ করেননি তাদের মধ্যে সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, সিনিয়র সাংবাদিক আবেদ খান অন্যতম। আজ বৃহস্পতিবার ইলেকট্রনিক ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। এতে অংশ নিতে ৩৪ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা সংলাপে অংশ নিয়ে নির্বাচনে সেনা মোতায়েন ও ‘না’ ভোটের বিধান চালুর সুপারিশ করেছেন। তবে অনেকে সেনা মোতায়েন ও না ভোটের বিধান চালুর ঘোর বিরোধিতা করেন। বিদ্যমান সীমানায় আগামী সংসদ নির্বাচনে পক্ষে জোরালো মতামত এসেছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য ১ শতাংশ ভোটের বিধান তুলে দেয়া, অনলাইনে মনোনয়ন দাখিলের ব্যবস্থা, ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দাখিলের ১৫ দিন আগে খেলাপি তালিকা থেকে মুক্ত হওয়া, নিজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্যে থেকে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ অসংখ্য পরামর্শ দেন গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা।সংলাপ থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজের একাংশের সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল জানিয়েছেন, বেশির ভাগই নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণের পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। সব দলের আস্থা অর্জনে ইসিকে সফল হতে হবে এমন পরামর্শ দেয়া হয়েছে।সিনিয়র সম্পাদক মাহফুজউল্লাহ বলেন, সংলাপে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই ধরনের নির্বাচন যেন ভবিষ্যতে না হয় সেজন্য কমিশনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। নির্বাচনের আগে মাঠ প্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে বলা হয়েছে।সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক ঐক্য জরুরি মন্তব্য করে ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, আমরা অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলার চেষ্টা করেছি। সুষ্ঠু ও নিরেপক্ষ নির্বাচনের পূর্বশর্ত হলো সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এজন্য রাজনৈতিক ঐকমত্য খুবই জরুরি। সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্ত নিশ্চিতে বিশেষ নজর দেয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।নির্বাচনে সেনা মোতায়েনে বিপক্ষে মত দিয়ে প্রেসক্লাবের সভাপতি শফিকুর রহমান বলেন, সেনাবাহিনী নির্বাচনে নয়, সেনা মোতায়েন হতে পারে একমাত্র জাতীয় বিপর্যয়ে। প্রচলিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যথেষ্ট। নির্বাচনে সেনাবাহিনী থাকলে অন্যান্য বাহিনীগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।সিনিয়র সাংবাদিক আমানুল্লাহ কবীর তার প্রস্তাবনায় সেনা মোতায়েন ও নির্বাচনে লেভেং প্লেইয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন। তিনি বিএনপির নাম উল্লেখ করে বলেন, বর্তমানে ওই দলটির অনেক নেতার নামে মামলা রয়েছে। ওই মামলার সূত্র ধরে নির্বাচনের সময় যাতে হয়রানির শিকার না হতে হয় তার জন্য নির্বাচনকালে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের মামলার হয়রানি থেকে রেহাই দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, নির্বাচনে সেনাবাহিনী, ‘না’ ভোট, সীমানা পুনঃনির্ধারণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমি সেনাবাহিনী মোতায়েনের পক্ষে মত দিয়েছি।বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজাম বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে যে প্রস্তাবগুলো এসেছে, সেগুলো হলো কিভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু করা যায়। ইসি যদি মনে করে সেনাবাহিনীর দরকার, তাহলে মোতায়েন করবে, না চাইলে নয়।প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলেছি। প্রত্যেক দল যেন ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করে, সে বিষয়ে কমিশনকে পদক্ষেপ নিতে বলেছি।দৈনিক ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত বলেন, বিদ্যমান সীমানাতেই ভোট করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ২০১১ সালে সর্বশেষ আদমশুমারি প্রতিবেদন হওয়ায় নতুন করে আর সীমানা পুনঃনির্ধারণের দরকার নেই। কেননা ২০১৩ সালে সর্বশেষ আদমশুমারির প্রতিবেদন অনুযায়ী সীমানা পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে নতুন প্রশাসনিক এলাকা ও বিলুপ্ত ছিটমহল যোগ করেই সংসদীয় আসনের গেজেট করার পরামর্শ দেন তিনি।বিএফইউজে একাংশের মহাসচিব এম আবদুল্লাহ তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশের প্রধান দুই দল-আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের পন্থা বের করতে হবে। দল নিরেপক্ষে সরকারের অধীনে কেবল গ্রহণযোগ একটি জাতীয় নির্বাচন সম্ভব।বৈঠক সূত্র জানায়, সংলাপে আমাদের অর্থনীতির সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান বলেছেন, সুষ্ঠু ভোটের চেয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন জরুরি। এমন কোনো পরিস্থিতি উদ্ভুত হলে প্রয়োজনে নির্বাচন বাতিলের মতো শক্ত অবস্থান নিতে হবে। প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, নির্বাচনের সময় দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের আচরণ কেমন হবে তা ইসিকে নির্ধারণ করতে হবে। কালের কণ্ঠের যুগ্ম-সম্পাদক মোস্তফা কামাল বলেছেন, সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে কমিশনকে দেওয়া ক্ষমতা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে  হবে। সিনিয়র সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার, মেরুদণ্ডহীন ইসি চাই না। সাপ্তাহিক’র  সম্পাদক গোলাম মর্তুজা বলেন, নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। বিএফইউজের একাংশের মহাসচিব ওমর ফারুক বলেন, আমলাদের অবসরের ৫ বছর পর নির্বাচনে যোগ্য করে আইন সংশোধন করতে হবে।ইসির পূর্ণশক্তির প্রয়োগ চান সাংবাদিকরাসংলাপের পর ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ গতকাল বুধবার উপস্থিত সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বলেন, সিনিয়র সাংবাদিকরা ওই নির্বাচনে প্রয়োজনে সেনা মোতায়ন, না ভোট চালুর পক্ষে-বিপক্ষে, অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমার জন্য ইসিকে পরামর্শ দিয়েছেন।