চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলার রায়

দেশ-বিদেশে আলোচিত নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত লে.কর্নেল (অব) তারেক সাঈদ, কাউন্সিলর নূর হোসেনসহ পনেরো জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে হাইকোর্ট। একইসঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এগারো আসামির সাজা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আদালত বলেছে, “নূর হোসেন হলো এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ‘মাস্টারমাইন্ড’। সঙ্গে ছিলেন তারেক সাঈদ, আরিফ হোসেন ও মাসুদ রানা। তারা অর্থের বিনিময়েই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। দণ্ডিতরা যে ধরনের অপরাধ করেছেন তারপরও যদি তাদের উপযুক্ত সাজা না দেওয়া হয় তাহলে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা তৈরি হবে।” বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ ও বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলামের ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে বলা হয়, দণ্ডিতরা সাত জনকে ইনজেকশন পুশের মাধ্যমে অচেতন করে মুখে পলিথিন পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করেছে। র্যাব হেফাজতে তাদের মৃত্যুযন্ত্রণা ছিল ভয়াবহ ও অকল্পনীয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যেরা এতটাই নির্দয় ছিল যে, হত্যার পর তাদের লাশ পেট চিরে নদীতে ফেলে দেয়। র্যাব সদস্যদের এই নৃশংসতা প্রমাণ করে মৃতদেহের উপর তারা কতটা নির্দয় ছিল।মৃত্যুদণ্ড বহালের পর নিহতদের স্বজনরা বিজয়সূচক ‘ভি’ চিহ্ন? প্রদর্শন করেন। তবে আসামিদের স্বজনরা ছিলেন নিশ্চুপ।

হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার সাড়ে তিন বছরের কম সময়ের মধ্যে নিম্ন ও উচ্চ আদালতে এই মামলার বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হলো। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এটা একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাধারণত ফৌজদারি মামলায় আমাদের দেশে বিচার বিলম্বের নজির রয়েছে। সেক্ষেত্রে এই মামলা একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

২০১৬ সালের ১৬ জানুয়ারি চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের দায়ে বিচারিক আদালত ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলো। এর বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল ও ডেথ রেফারেন্স অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গতকাল নিষ্পত্তি করে হাইকোর্ট। রায়ে হাইকোর্ট ১৫ আসামির সর্বোচ্চ সাজা বহাল রেখেছে। যাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে তারা হলেন তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর (অব) মো. আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার (বরখাস্ত) মাসুদ রানা, কাউন্সিলর নূর হোসেন, ল্যান্স নায়েক মো. বেলাল হোসেন, হাবিলদার মো. এমদাদুল হক, আরওজি-১ মো. আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক মো. হীরা মিয়া, সেপাই আবু তৈয়ব, কনস্টেবল মো. শিহাবউদ্দিন, এসআই পূর্ণেন্দুবালা, সৈনিক (বরখাস্ত) মো. আব্দুল আলিম, সৈনিক (বরখাস্ত) মহিউদ্দিন মুন্সী (পলাতক), সৈনিক (বরখাস্ত) আল-আমিন শরীফ (পলাতক) ও সৈনিক (বরখাস্ত) মো. তাজুল ইসলাম (পলাতক)।

রায়ে বলা হয়, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আসামিরা যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তাতে উঠে এসেছে, হত্যাকাণ্ডটি ছিল সুপরিকল্পিত ও ষড়যন্ত্রমূলক। এছাড়া হত্যা সংঘটনে আর্থিক লেনদেন হয়েছে কাউন্সিলর নূর হোসেনের সঙ্গে। নূর হোসেনই হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী।

আসামি পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এ মামলায় প্রত্যক্ষদর্শী কোনো সাক্ষ্য নেই এবং আর্থিক লেনদেনেরও কোনো প্রমাণ নেই। এই দাবি নাকচ করে দিয়ে রায়ে পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছেন, র্যাবের তত্কালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান টাকা লেনদেনের বিষয়ে আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। এছাড়া নিহত নজরুল ইসলামের শ্বশুড় শহীদুল ইসলাম তারেক সাঈদের সঙ্গে দেখা করে বলেছেন, নূর হোসেন যত টাকা দিয়েছে তার চেয়ে বেশি টাকা দেব, তবুও নজরুলকে ছেড়ে দিন। এ থেকে প্রমাণ করে যে, অর্থের বিনিময়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। আর এই অনৈতিক লেনদেনের কোনো প্রমাণ থাকে না। রায়ে মৃত্যুদণ্ড হ্রাস করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া ১১ জন হলেন সৈনিক মো. আসাদুজ্জামান নূর, সার্জেন্ট (বরখাস্ত) এনামুল কবির, মো. মূর্তজা জামান চার্চিল, আলী মোহাম্মদ, মো. মিজানুর রহমান দীপু ওরফে মিজান, মো. রহম আলী, মো. আবুল বাশার, সেলিম, মো. সানাউল্লাহ ওরফে সানা (পলাতক), ম্যানেজার শাহজাহান (পলাতক) ও জামালউদ্দিন। সাজা হ্রাসের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, অপরাধের ধরণ বিবেচনায় নিয়ে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে সেটা হবে কঠোর শাস্তি। তাই তাদের যাজজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়াই হচ্ছে যুক্তিযুক্ত।