মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের উপর হঠাত বেড়ে গেছে নির্যাতন

রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থি বৌদ্ধদের নির্যাতন হঠাত্ বেড়েছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে সেখানে ত্রাণসহায়তাও পৌঁছতে পারছে না। চরম খাদ্য সংকট বিরাজ করছে। প্রাণ বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, গতকাল সোমবার হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে এসেছে।

এদিকে নাফ নদে রোহিঙ্গা বোঝাই দুটি নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটেছে। নৌকা দুটিতে ১১৬ জন রোহিঙ্গা ছিল। এদের মধ্যে নারী ও শিশুসহ ১৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ৩০ জন রোহিঙ্গাকে জীবিত উদ্ধার করা গেছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছে ৭৩ জন। গতকাল সোমবার ভোরে ও আগের দিন রাতে এই নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটে।

অন্যদিকে, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর নৃশংসতা ও নির্যাতন চললেও দেশটির রাজধানীর জনজীবন একেবারেই স্বাভাবিক। রাখাইনে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটলেও ইয়াংগুনে এর কোনো প্রভাব নেই। বিবিসির প্রতিবেদনে ফুটে ওঠেছে ইয়াংগুনের চিত্র।

পালংখালি সীমান্তে গতকাল সৈয়দ আজিন বলেন, আমার গ্রামের অর্ধেক বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গত আটদিন ধরে আজিন তার ৮০ বছর বয়সী মাকে একটি ঝুড়িতে করে বহন করে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, সেনা ও উগ্রপন্থি বৌদ্ধরা তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে। কয়েকজন অভিযোগ করেন, উগ্রপন্থি বৌদ্ধরা তাদের তাড়িয়ে সীমান্তের কাছে নিয়ে আসছে।
 রাখাইনের বুচিদংয়ের কুহং এলাকা হতে একটি নৌকা ৭৬ জন নারী-পুরুষ ও শিশু নিয়ে রওনা হয়। নাফ নদ অতিক্রম করে বাংলাদেশ সীমান্তে আসার অভিপ্রায় ছিল রোহিঙ্গাদের। গতকাল ভোর চারটার দিকে ঘোলার চরে নৌকাটি পৌঁছে। প্রবল ঢেউয়ের তোড়ে নৌকাটি সেখানে ডুবে যায়। নৌকা ডুবির ঘটনায় প্রাণে রক্ষা পেয়েছে আরাফাত। তার মা-বাবা ডুবে মারা গেছে। একই ঘটনায় স্ত্রী হারিয়েছেন হাসান এবং ছেলে-মেয়ে হারিয়েছেন শাকের।  জীবিত আরাফাত, হাসান ও শাকের এসব তথ্য জানান।

এদিকে গত রবিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে একই পয়েন্টে আরেকটি নৌকা ডুবে। নৌকাটি নাইক্যংদিয়া থেকে রওনা হয়। তাতে ৩৫/৪০জন রোহিঙ্গা ছিল। বিজিবি টহলদল নদীর মধ্যে নারী-শিশুর কান্না শুনে উদ্ধার কাজে নামে।
যারা উদ্ধার হয়েছে তারা জানান, সেনাবাহিনীর নির্যাতন, হামলা ও খুনের পর রোহিঙ্গাদের তাদের এলাকায় অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এতে সেখানে চরম খাদ্য সংকট বিরাজ করছে। তারা একমুঠো খাবারের জন্য বাংলাদেশ আসতে গিয়েই এই দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।
এদিকে সকালে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর উপকূল থেকে কোস্টগার্ড, বিজিবি ও স্থানীয় জনসাধারণ ১০ শিশু-কিশোর, একজন নারীসহ মোট ১৩ জনের লাশ উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃত লাশ স্থানীয় গোরস্থানে জানাজা শেষে দাফন করা হয়েছে। টেকনাফ মডেল থানার ওসি মো. মাইন উদ্দিন খান ১৩ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করে দাফনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ইয়াংগুনের জনজীবন স্বাভাবিক

বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, মিয়ানমারের রাখাইনের পশ্চিমাঞ্চলে গত এক মাস ধরে ব্যাপক মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু ইয়াংগুন থেকে তা বোঝার কোনো উপায় নেই। ২৫ আগস্ট পুলিশের চৌকিতে হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর সেনাবাহিনীর নির্যাতনে প্রায় সোয়া  ৫ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে।সহিংসতা বন্ধ করতে, রাখাইনের অস্থিতিশীলতার সমাধান বের করা ও মানবিকসহায়তা প্রদানে অনুমতি প্রদানের জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের ওপর ব্যাপক চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। এরমধ্যেও দেশটির সবচেয়ে বৃহত্ শহর ইয়াংগুনকে বাইরে থেকে শান্তই মনে হয়। শহরে পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট, সুশৃঙ্খল ও সবুজ গাছপালা। কোথাও যদি ভিড় থাকে, তা শুধুমাত্র সড়কে-যানজট। ছিমছাম পোশাক পরিহিত নারী ও পুরুষ তাদের নিত্যকর্ম সম্পাদন করে। এখানের লোকজন কখনো রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার করে না। তাদেরকে গণমাধ্যমে ‘বাঙালি মুসলমান’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এমনকি কোথাও তাদেরকে বাংলাদেশ থেকে আসা বাঙালি অভিবাসী হিসেবে দেখা হয়।  

ওই প্রতিবেদক বলেন, আমি যখন রোহিঙ্গা ইস্যুটি উত্থাপন করি, কেউ স্পষ্ট করে তাদের মতামত ব্যক্ত করেছে। কেউ বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করেছে। এও বলেছে, দেশে আরো অনেক ইস্যু রয়েছে। মিয়ানমার প্রেস কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ইউ অং তুনসহ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরাও এ ধরনের মনোভাব পোষণ করেন। তিনি বলেন, সমস্যা হলো, শব্দটি (রোহিঙ্গা) ব্যবহারের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। আমি যখন ছোট ছিলাম, আমার বেশ কিছু বাঙালি বন্ধু ছিল। তারা কখনো দাবি করেনি তারা রোহিঙ্গা। অল্প কয়েক বছর আগে তারা রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার শুরু করে। তারা এ দেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী হতে পারে না। এটাই প্রকৃত সত্য।গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সারাবিশ্বের গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম দখল করে রেখেছে রোহিঙ্গা ইস্যু। বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা কী ধরনের মানবেতর জীবন যাপন করছে, এখানকার সংবাদপত্রে কদাচিত্ প্রসঙ্গটি উল্লেখ হয়। উল্টো সংবাদে প্রাধান্য পেয়েছে সেনাবাহিনীর হিন্দুদের গণকবর পাওয়ার প্রসঙ্গ। বলা হয় আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়।ওই প্রতিবেদক বলেন, ইয়াংগুন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আমি অবাক হতাম, যদি ছাত্রদের মধ্যে একটু ভিন্ন আবহ দেখতে পেতাম। অথচ আগের প্রজন্মের চেয়েও তাদের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সংযোগ অনেক বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেতে কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে আলাপ করতে গেলে তারা এ বিষয়ে কথা বলতেই চায়নি। কয়েকজন নাম পর্যন্ত বলতে চায়নি। কিন্তু আমি যখন রাখাইন প্রসঙ্গটি উঠালাম, সঙ্গে সঙ্গে জবাব পেলাম।এক ছাত্রী বলল, বাইরে থেকে ইস্যুটি দেখলে, এটি একটি ধর্মীয় সমস্যা। কিন্তু এটি তা নয়। ওখানে যে সহিংসতা তা সন্ত্রাসবাদের নামান্তর। আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় রাখাইনের পরিস্থিতি নিয়ে ভ্রান্ত তথ্য পাচ্ছে। কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে তার আরো দুই বন্ধু বলল, বিদেশিদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মনে হয় তারা সঠিক। কিন্তু আমাদের দিক দেখলে আমরাই ঠিক আছি।

প্রতিবেদক বলেন, কয়েকদিন পর আমি ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত জাফরান বিপ্লবের দশম বার্ষিকী পালন অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। হাজার হাজার বৌদ্ধ সন্ন্যাসী শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছিল। মিয়ানমারের জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত ওই বিপ্লবের খবর সারাবিশ্বের নজর কেড়েছিল। বৌদ্ধ ভিক্ষু, গণতন্ত্রবাদী কর্মী ও ইউনিয়ন সদস্যরা জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। ওই সাংবাদিক আরো বলেন, আমি ভেবেছিলাম, যেহেতু তারা রাজনৈতিক বন্দি, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের সমর্থন করার দায়ে জেল খেটেছেন, তাদের মধ্যে অন্তত কারো কারো রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি ভিন্ন মনোভাব থাকবে। শয়ে টুনটে সায়ার ছিলেন ওই বিপ্লবের একজন প্রথম দিকের নেতা। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি যেহেতু এখানে মাত্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে, এটা কী মিয়ানমারের দায়িত্ব নয় রোহিঙ্গাসহ সব সমপ্রদায়কে সমদৃষ্টিতে দেখা। তিনি উত্তর দিলেন, গণতন্ত্রে সবাই সমান। কিন্তু সন্ত্রাসীরা না। যদি তারা সন্ত্রাসবাদ গ্রহণ করে, তাহলে সারাবিশ্বের সকল মানুষের উচিত একত্রিত হয়ে সন্ত্রাসবাদ ধ্বংস করা। নইলে তারা আমাদের প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেবে।
মিয়ানমার এর আগেও লোকজনকে দেশছাড়া করেছে। ১৯৬০ এর দশকে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের কিছু পরেই কয়েক লাখ মানুষকে ভারতীয় নাগরিক দাবি করে তাদের দেশ ছাড়তে নির্দেশ দেয়। কয়েক শতাব্দী ধরে ভারতীয়রা মিয়ানমারে বসবাস করে আসছে। উনিশ শতক ও বিংশ শতকের প্রথমদিকে দেশটি যখন ব্রিটিশভারতের অধীনে ছিল উপনিবেশিক শাসকরা তাদের নিয়ে আসে।
ওই প্রতিবেদক আরো বলেন, ইয়াংগুন ও মূলধারার বার্মিজ গণমাধ্যম কেন রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সহিংসতার বিষয়টি অস্বীকার করছে, সে বিষয়টি জানান চেষ্টা করি।
একজন জ্যেষ্ঠ সম্পাদক এবং সাবেক রাজনৈতিক বন্দি এর উত্তর দেন। যদিও তিনি তার নাম বলেননি। তিনি বলেন, প্রত্যেকের মধ্যে ভীতি কাজ করছে। কেউই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চায় না। প্রথমত সেখানে একটি নিরাপত্তা সংকট চলছে। বেশিরভাগ সংবাদই প্রচার হচ্ছে অফিসিয়াল সংবাদ বিজ্ঞপ্তি উপজীব্য করে। তিনি আরো বলেন, এছাড়া রয়েছে জনগণের চাপ। মূলধারার মতাদর্শের বিরুদ্ধে গেলে বন্ধু ও স্বজনরাও এখানে অপছন্দ করে।