বগুড়ায় মা ও মেয়ে নির্যাতন,তুফান সহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন

বগুড়ায় ছাত্রী ধর্ষণ ও পরে মা সহ তাকে নির্যাতন করে মাথা ন্যাড়া করার আলোচিত ঘটনার দুটি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিয়েছে পুলিশ। এতে বগুড়ার শহর শ্রমিক লীগের বহিষ্কৃত আহ্বায়ক তুফান সরকারসহ ১৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা  বগুড়া  সদর থানার পুলিশ পরিদর্শক  (অপারেশন) আবুল কালাম আজাদ মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬  টার দিকে
 জেলার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে চার্জশিট দুটি দাখিল করেন। তিনি জানান, মামলা দু’টির অভিযোপত্র আদালতের জিআরও শাজাহান মিয়ার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আজ বুধবার আদালতে উপস্থাপন করা হবে।
যাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে তারা হলেন : তুফান সরকার, তার স্ত্রী আশা খাতুন, স্ত্রী’র বড় বোন বগুড়া পৌরসভার ৪, ৫, ৬ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর মার্জিয়া হাসান রুমকি, শ্বশুর জামিলুর রহমান রুনু, শাশুড়ি রুমি খাতুন, তুফান বাহিনীর সদস্য আতিক, মুন্না, আলী আজম দিপু, রূপম, শিমুল, জিতু, রুমকির সহযোগি আন্জুয়ারা ও  নাপিত জীবন রবিদাস। এদের মধ্যে শিমুল পলাতক রয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রুনু, আনজুয়ারা ও জীবন এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন না। পরে তাদের চার্জশিটভুক্ত করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ চার্জশিট দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, দুটি মামলায় প্রধান অভিযুক্ত তুফান। ধর্ষণের ঘটনায় রুনু, নাপিত জীবন ও আনজুয়ারার সম্পৃক্ততার স্বাক্ষ্য-প্রমাণ মেলেনি। তাই ওই মামলা থেকে ৩ জনকে অব্যাহতি দানের সুপারিশ করা হয়েছে। এ মামলায় মোট ১০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে মা-মেয়েকে নির্যাতন ও মাথা ন্যাড়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ওই ৩ জনসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধেই সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাই এ মামলায় সকলের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। পলাতক আসামি শিমুলকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান।
জানা গেছে, আসামিদের মধ্যে তুফান বগুড়া জেলে মাদক সেবন করায় তাকে কাশিমপুর কারাগারের হাইসিকিউরিটি সেলে পাঠানো হয়েছে। তার শ্বশুর রুনু একটি মামলায় জামিন পেলেও অপরটিতে জামিন পাননি । ফলে রুনুসহ ১১ জন বগুড়া কারাগারে আছেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রধান আসামি তুফানের সহযোগি আতিক, দিপু এবং  নাপিত জীবন আদালতে মা ও মেয়েকে ন্যাড়া এবং নির্যাতনের কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে তুফানসহ অন্য কারো স্বীকারোক্তি আদায় করা সম্ভব হয়নি। ভিকটিম ছাত্রীও আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। এছাড়া বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্টে ছাত্রীকে ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখসহ  ঘটনার শিকার শিক্ষার্থীকে নাবালিকা বলা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে মোট ১৬ জন সাক্ষী রাখা হয়েছে। আলামত হিসেবে তুফানের প্রাইভেট কার, দুটি ক্ষুর, দুটি কাঁচি, ভিকটিমদের স্বাক্ষর নেওয়া কাউন্সিলর রুমকির পৌরসভার প্যাডের পাতা, এসএস পাইপ এবং মা ও মেয়ের কেটে ফেলা চুল দেখানো হয়েছে ।
সদ্য এসএসসি পাশ ওই শিক্ষার্থীকে বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজে ভর্তি করে দেওয়ার কথা বলে গত ১৭ জুলাই কৌশলে বাড়িতে ডেকে নিয়ে শ্রমিক লীগ নেতা তুফান সরকার ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি জানতে পেরে তুফানের স্ত্রী আশা স্বামীকে দায়ী না করে ঘটনার জন্য ভিকটিমকেই দায়ী করেন। এরপর আশা তার বোন মার্জিয়া হাসান রুমকির মাধ্যমে ২৮ জুলাই ভিকটিম ও তার মাকে কাউন্সিলরের বাসায় ডেকে নেন। সেখানে তাদের মারধরের পর মাথার চুল কেটে দেওয়া হয়। তারা যাতে আদালতের আশ্রয় নিতে না পারে সে জন্য তাদের কাছ থেকে পৌরসভার প্যাডে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে প্রতিবেশীর সহায়তায় তারা হাসপাতালে ভর্তি হলে ঘটনাটি প্রকাশ পায়। পুলিশ ঘটনার রাতেই তুফানসহ তার তিন সহযোগীকে গ্রেফতার করে। ২৯ জুলাই তুফানসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় পৃথক ২টি মামলা করেন নির্যাতনের শিকার ওই শিক্ষার্থীর মা । ৩০ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ ১ জন ছাড়া বাকি সকল আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। শ্রমিকলীগ থেকে তুফানকে বহিস্কার করা হয়। বর্তমানে নির্যাতিত মা-মেয়ে আদালতের নির্দেশে রাজশাহীর সেফহোম এবং ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে আছেন।