ফেসবুক স্টাটাসের জেরঃ রংপুরে বাড়িঘরে আগুন, সংঘর্ষে নিহত ১

ফেসবুকে পোস্ট করা ধর্মীয় কটূক্তিসম্বলিত কথিত স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে গতকাল শুক্রবার রংপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় পুলিশ ও হামলাকারীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে হাবিবুর রহমান হাবিব (৩০) নামে এক যুবক নিহত এবং অর্ধশতাধিক ব্যক্তি কম-বেশি আহত হয়েছে। গুরুতর আহতদের মধ্যে তিন জন পুলিশ ও সংঘর্ষে লিপ্ত ১১ জনকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশের আরও বেশ কয়েকজন সদস্যকে প্রাথমিক চিকিত্সা দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালের সহকারি পরিচালক শফিকুল ইসলাম জানান, এদের মধ্যে মাহাবুবুল (২৫), জামিল (২৬), হাবিবুর রহমান (৩০), আলিম (৩২), জাহাঙ্গীর (২৮), আমিন (২৬) ও রিপনের (২৮) অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের পেটে ও মাথায় বুলেটবিদ্ধ হয়েছে। অন্যদের পায়ে ও হাতে রাবার বুলেট বিদ্ধ হয়। চিকিত্সাধীন অবস্থায় সন্ধ্যায় মারা যান হাবিবুর রহমান। তিনি শলেয়াশাহ এলাকার একরামুল হকের ছেলে বলে হাসপাতালের ভর্তি রেজিস্টারে উল্লেখ রয়েছে।  বিপুলসংখ্যক ছররাগুলি ও রাবার বুলেট ছুঁড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ।  আহত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে তিন জনের নাম পাওয়া গেছে। এরা হলেন এসআই সেলিম মিয়া, কনসটেবল নাসির হোসেন, রফিকুল ইসলাম। রাত সাড়ে ৯টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত ঘটনাস্থল রংপুর মহানগরীর পাগলাপীর ও গঙ্গাচড়া উপজেলার খলেয়া ইউনিয়নের ঠাকুরপাড়া এলাকায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছিলো। সেখানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। জুম্মার নামাজের পর গতকাল দুপুর দুইটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে হামলাকারীরা। এ সময় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
গতকাল রাতে জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ফেসবুকে দেয়া স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ চক্র সহিংস ঘটনা ঘটিয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) আবু রাফা মোঃ আরিফকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সার্কেল-এ) সাইফুর রহমান এবং সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান। জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এতো অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ এক হয়ে সহিংস ঘটনা ঘটানোয় আমরা এটিকে পরিকল্পিত বলে মনে করছি।’ কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার খলেয়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সভাপতি হাসানুজ্জামান হাসু শাহ্ অভিযোগ করেন, গত মঙ্গলবার ওই ইউনিয়নের টিটু রায় নামে এক যুবকের ফেসবুকে হযরত মুহম্মদ (সাঃ) কে নিয়ে কথিত কটূক্তির প্রতিবাদে এলাকাবাসী মানববন্ধন করে। এ ঘটনাকে পুঁজি করে জামায়াত ইসলামের নেতাকর্মীরা গত কয়েকদিন থেকে রংপুরের গঙ্গাচড়া, তারাগঞ্জ, নীলফামারী জেলার কয়েকটি উপজেলার বিভিন্ন মসজিদে প্রচার চালিয়ে দলীয় নেতাকর্মীসহ মুসল্লিদের উত্তেজিত করে তোলে। গতকাল জুমার নামাজের পর জামায়াত-শিবিরের কয়েক হাজার নেতাকর্মী সংঘবদ্ধ হয়ে পাগলাপীল এলাকায় পরিকল্পিতভাবে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে। পরে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি-ঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় সেখানকার দুটি মন্দিরে আগুন দেয় তারা এবং মন্দিরের মাইকসহ অন্যান্য জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। এর মধ্যে একটি মন্দির আগুনে পুড়ে ভষ্মীভূত হয়। এ সময় হামলাকারীরা হিন্দু সম্প্রদায়ের ১৫-২০টি বাড়ির গরু-ছাগল, হাস-মুরগি লুটপাট করে নেওয়াসহ তাদের ধান, গোলা ঘর, খড়ের গাদায় আগুন লাগিয়ে দেয়।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, টিটু রায়ের ৩টি ঘর ছাড়াও সুধীর রায়ের ৬টি ঘর, অমূল্য রায়ের দুটি ঘর, বিধান রায়ের দুটি ঘর, কৌশল্ল রায়ের দুটি, কুলীন রায়ের একটি, দীনেশ রায়ের একটি, ক্ষীরোদ রায়ের একটি ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
গঙ্গাচড়া থানার ওসি (তদন্ত) নজরুল ইসলাম গতকাল রাতে জানান, প্রাথমিক তদন্তে জানা যায় জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা সংঘব্ধ হয়ে এই নাশকতা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটিয়েছে। তিনি জানান, ৮-১০টি বাড়ির ২০টি ঘরে আগুন দেওয়া হলে সেগুলো আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এছাড়া আরো প্রায় ১৫-২০ বাড়ির গরু-ছাগল, হাস-মুরগি লুটপাটসহ তাদের ধান, গোলাঘর, খড়ের গাদায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। খগেন রায়ের পুত্র টিটু ৮ বছর থেকে নারায়ণগঞ্জে চাকরি করেন। ধারণা করা হচ্ছে তার মোবাইল ফোন থেকেই ধর্মীয় উস্কানি দেওয়া হয়েছে।
অপরদিকে টিটু রায়ের ভাই বিপুল রায় বলেন, ‘আমার ভাই অশিক্ষিত। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় কবিরাজি করে বেড়ায়। সে ফেসবুক তেমন চালাতে পারে না। টিটু ফেসবুকে কোনো স্ট্যাটাস দেয়নি। কে বা কারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে তার ফেসবুকে পরিকল্পিভাবে হযরত মুহম্মদ (সাঃ) কে কটাক্ষ করে স্ট্যাটাস দেয়।’ টিটু রায়ের মা জিতেনবালা বলেন, ‘কেন আমাদের বাড়ি-ঘরে আগুন দেওয়া হলো আমরা জানি না।’
গঙ্গাচড়া থানার ওসি জিন্নাত আলী জানান, উপজেলার খলেয়া ইউনিয়নের লাল চান্দুপুর গ্রামের বাসিন্দা ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে টিটু রায়কে আসামি করে গত ৫ নভেম্বর গঙ্গাচড়া থানায় মামলা করেন। টিটু রায় নারাগঞ্জের ফতুল্লায় দুই স্ত্রী-সন্তান বাস করেন। তিনি আরো জানান, টিটু রায়ের বাড়িসহ ওই এলাকার দিয়ে ৮/১০টি বাড়ির ২০ ঘরে আগুন দেওয়া হলে সেগুলো ভস্মীভূত হয়ে যায়।
এই স্ট্যাটাসের জের ধরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে এই সংঘবদ্ধ চক্র হাজার হাজার জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর এক জোট হয়ে পাগলাপীর বাজারে মানববন্ধন শুরু করেন। এক পর্যায়ে এই সংঘবদ্ধ চক্র গঙ্গাচড়া উপজেলার খলেয়া ইউনিয়নের হিন্দু অধ্যুষিত ঠাকুরপাড়ার দিকে অগ্রসর হতে থাকলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এতে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে রংপুর কোতয়ালী থানা, পুলিশ লাইন, গঙ্গাচড়া ও তারাগঞ্জ থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সার্কেল-এ) সাইফুর রহমান জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে। এ ঘটনার পর পাগলাপীর ও এর আশপাশের গ্রামগুলো পুরুষশুন্য হয়ে পড়েছে বলে ইত্তেফাক জানায়।