আজো কানে বাজে সেই ঘণ্টা

২০০৩ সালের ৩ ডিসেম্বর, বুধবার। আব্বু সাইকেলের পেছনে করে নিয়ে গেলেন স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার জন্য। রুমে ঢুকেই চোখে পড়ল একটি বেঞ্চিতে টান টান হয়ে শুয়ে আছেন একটি লোক। একদমই অচেনা নন। আমাদের গ্রামের গৌর কাকা। গ্রামে একটি বড় মুদি দোকান আছে। সেই সুবাদে খুব ভালো করেই তাকে চিনি। তা ছাড়া দেখা হলেই ‘বাবা’ বলে ডাক দিতেন গৌর কাকা। রুমের একদম মিডলে একটি চেয়ার-টেবিলে ভালো পোশাক পরে বসেছিলেন এক ভদ্রলোক। পরে ঠিকই বুঝতে পারলাম উনিই স্কুলের হেডমাস্টার। আব্বুর সাথে আগে থেকেই চেনা-জানা আছে। আব্বু বলার আগেই গৌর কাকা আমার হাত ধরে তার কাছে নিয়ে বসালেন এবং হেড স্যারকে আমার সম্পর্কে অনেক কথা বললেন। পরিচয়ের সাথে জুড়ে দিলেন কয়েকটি ভালোর সার্টিফিকেট। পরে গৌর কাকা আমাকে পাশের একটি রুমে নিয়ে এক স্যারের কাছে আমার ভর্তির কাজ সমাধা করলেন। গৌর কাকা কয়েকজন স্যারের সাথেও পরিচয় করিয়ে দিলেন। এবং আমাকে বললেন উনারা সবাই আমার কাস নেবেন।

বাড়ি ফেরার সময় আব্বুর কাছে জানতে চাইলাম গৌর কাকা আসলে স্কুলে কিসের চাকরি করেন। আব্বু উত্তরে জানালেন, তোর গৌর কাকা এই স্কুল চালাই। গৌর কাকার কথায় সব ছাত্র ছাত্রীকে চলতে হয়। আরো বললেন স্কুলে গেলেই টের পাইবি সব।

২০০৪ সালের পয়লা জানুয়ারি স্কুলে গিয়ে হাজির হলাম। ঘং ঘং করে ঘণ্টার জোর আওয়াজ কানে গেল। কোথা থেকে আওয়াজটা এলো সেটি আমি আঁচ করতে পারলাম না। আমার নতুন স্কুল নতুন মানুষ। সব কিছু মিলিয়ে এক নতুনত্ব বিরাজমান আমার ভেতর। নতুন নিয়মনীতিগুলো তখন আমার একদমই অজানা। তবুও আমার নতুন কিছু বন্ধুদের অনুসরণ করে ওদের পেছন পেছন চলতে থাকলাম। সবাই এক জায়গায় সমবেত হলো। প্রতিটি কাসের জন্য এক একটি লাইন হলো আমিও দাঁড়িয়ে গেলাম আমাদের লাইনে। আমরা সব ছাত্রছাত্রী পুরনো বিল্ডিংয়ের সামনের খোলা মাঠে পূর্বমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে। বিল্ডিংয়ের বারান্দায় এসে এক এক করে দাঁড়াতে লাগলেন সব স্যার। একসময় দেখলাম হেড স্যারের সাথে গৌর কাকাও এসে পেছনে হাত বেঁধে দাঁড়ালেন। শপথ পরানো হলো। জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে সবাই একসাথে জাতীয় সঙ্গীত গাইলাম। এবং শেষে সবাই সবার কাসের দিকে সারিবদ্ধভাবে যেতে লাগল। আবার বেজে উঠল এক এক করে আটটি ঘণ্টা। দেখলাম গৌর কাকা গায়ের জোরে এক এক করে বাড়ি দিচ্ছেন। ঘণ্টা শেষ করে আবার গৌর কাকা হেডস্যারের রুমের ভেতর ঢুকে গেলেন। আমি বুঝতে পারলাম গৌর কাকার কাজটা কী।

আস্তে আস্তে করে জানতে ও বুঝতে পারলাম গৌর কাকা হেডস্যারের খুবই একজন কাছের মানুষ। স্কুলের সবাই উনাকে খুব ভালোবাসেন, শ্রদ্ধাও করেন। বয়সে সবার ঊর্ধ্বে। চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী হলেও সবাই আপনি করে সম্বোধন করেন এবং অনেক মূল্যায়ন করেন।

সব ধরনের নোটিশসহ যেসব ছাত্রছাত্রীকে জানানো দরকারি সেগুলো জানাতেই হাজির হতেন কাকা। এসে কাসে ঢুকে স্যারের হাতে তুলে দিতেন নোটিশখাতা। স্যার সেটি পড়ে শোনাতেন। পরীক্ষার সময় হলে স্কুলে টাকা জমা দেয়ার জন্য হাজির হতেন সব অভিভাবক। গ্রামের স্কুল। বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রী গরিব পরিবারের। টাকা-পয়সার টানাপড়েন তো আছেই। অভাব-অনটন সবার নিত্যসঙ্গী। গৌর কাকা নিজের থেকেই স্যারদের সুপারিশ করে অনেকের টাকার পরিমাণ কমিয়ে দিতেন। গরিবের কষ্ট বোঝার ক্ষমতা ছিল তার প্রখর। নিজ ইচ্ছায় এগিয়ে যেতেন সাহায্য করতে। শুধু গ্রামের ছেলেমেয়ের জন্য নয়, গৌর কাকা সবার জন্যই এমনটি করতেন।

সাদা একটা দুই পকেটওয়ালা ফতুয়া আর পরেন একটি সাদা পায়জামা। সামনের দিকে একটু কুঁজা হয়েই হাঁটতেন। ঘণ্টা বাজাতেন ঠিক নিয়মমতো।

তখন কাস টেনে পড়ি। টিফিনের সময় আমরা কয়েকজন মিলে ভলিবল খেলছিলাম। হঠাৎ কানে এলো হেডস্যারের রুমে ঝামেলা বেধেছে। খেলা বন্ধ করে ছুটে গেলাম হেডস্যারের রুমের সামনে। দেখতে পেলাম এক করুণ দৃশ্য। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির লোকদের সাথে ঝামেলা বেধেছে হেডস্যারের। তখন স্কুলের কমিটির দায়িত্বে থাকা লোকগুলো ছিল পাশের এক ক্ষমতাশালী গ্রামের কিছু উচ্ছৃঙ্খল মানুষ। টাকা-পয়সা মেরে খেতে তারা অভ্যস্ত। ঝামেলার একপর্যায় হেডস্যারের কলার ধরে বারান্দার ফোরে ফেলে বেদম মারধর করতে লাগল। গৌর কাকা সেসব লোকের নাম ধরে বারবার বলছিলেন এটি অন্যায়। এটি কী করছিস তোরা। হেডস্যারকে মারা দেখে আর এক সম্মানীয় স্যারÑ যাকে সম্মান করতেন মন থেকে সব ছাত্রছাত্রীÑ তিনিও এসে বাধা দিতে গেলেই তাকেও ধাক্কা দিয়ে বারান্দা থেকে ফেলে দিলেন। গৌর কাকা তাদের পা জড়িয়ে ধরে অনুরোধ করলেন। একসময় গৌর কাকাকেও ছিটকে ফেলে দিলেন। এবং বুকের ওপর পা দিয়ে আঘাত করলেন। তারপর ছাত্ররা ও অন্য সব স্যার এবং বাজার থেকে কিছু লোক এসে পরিস্থিতি অনুকূলে আনলেন।

ছাত্রছাত্রীরা জোট বেঁধে পরদিন থেকে ধর্মঘট শুরু করলেন। শুরু হলো মিছিল-মিটিং আর পোস্টারিং। চার-পাঁচ দিন এভাবে নিয়মমতো চলতে থাকল ধর্মঘট। স্কুলের দেয়ালে রঙচঙ দিয়ে বড় বড় করে নামোল্লেখ করেই লেখা হলো ‘সন্ত্রাসীদের বিচার চাই’।

থানা থেকে পুলিশ ও শিক্ষক সমিতিকে উপরিপর্যায়ের লোকজন এসে একটা সমঝোতা করে দিলেন। কিন্তু গৌর কাকা আর স্কুলে এলেন না। বাজারেও আসতেন না কিছু দিন।

একদিন বিকেলবেলা কেরোসিন তেল কেনার জন্য গৌর কাকাদের দোকানে গেছি। দেখি দোকানের সামনে অনেক মানুষ জমায়েত হয়েছে। এগিয়ে দেখি সেসব লোক যারা হেডস্যারসহ বক্কর স্যারকে মেরেছিলেন বেদমভাবে। আর গৌর কাকা যাদের পা ধরে অনুরোধ করতে গিয়ে লাথি খেয়ে ছিটকে পড়েছিলেন। সেসব লোক গৌর কাকার হাত ধরে ক্ষমা চাইতে এসেছেন। এবং গৌর কাকাকে বুকে টেনে কোলাকুলিও করলেন। অনেক অনুরোধ করলেন স্কুলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু গৌর কাকা আবেগি সুরে বললেন ‘নাহ’ স্কুলে আর যাবো না। ‘স্কুল’কে সে দিনই বিদায় দিয়ে এসেছি। অবশেষে হাসি মুখেই ফিরিয়ে দিলেন সেসব লোককে।

গৌর কাকা এখন খুব অসুস্থ। ক্যান্সারের শিকার। গলায় তিনার আজ বিরাট ব্যাধি। ইন্ডিয়া ঘুরে এসেছেন কিন্তু কোনো পরিবর্তন নেই। কথা বলতে পারেন না। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় বিধায় ডাক্তার গলায় ছিদ্র করে ক্যানোলা জাতীয় কিছু লাগিয়ে দিয়েছেন সেখান দিয়েই নিঃশ্বাস নেন কাকা। এখনো দেখা হলে কথার বলার জন্য এগিয়ে আসেন। কথা বলার সময় গলার সেই ছিদ্র হাতের আঙুল দিয়ে বন্ধ করে কথা বলেন আবছা আবছা অস্পষ্ট কথা বের হয়।

আমি এক বিকেলে মনে করে গৌর কাকার ছবি তুলতে গেলাম। আমি যখন ছবি তুলতে চাইলাম গৌর কাকা গলায় লাগানো ছিদ্রে হাত দিয়ে বন্ধ করে বললেন, আজ দুপুরে রাস্তায় এক ছেলের সাথে দেখা। সে গঙ্গারামপুর স্কুলে পড়ত। এখন সে দারোগা হয়েছে। আমাকে দেখে মোটরসাইকেল থামিয়ে সব কথা শুনে পকেট থেকে ৫০০ টাকা দিয়ে বলেছেন, ‘কাকা আপনি কিছু ফল কিনে খাইয়েন’ এ কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন গৌর কাকা। অশ্রুসিক্ত নয়নে জড়িয়ে ধরলেন আমাকে। যতই দিন যাচ্ছে গৌর কাকার শ্বাস-প্রশ্বাসে আরো সমস্যা হচ্ছে। অনেক কষ্টে পার হচ্ছে গৌর কাকার প্রতিটি মুহূর্ত।

আজ আমি অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। স্কুলকে বিদায় জানিয়েছি অনেক বছর আগে। অনেক বন্ধুর নাম পর্যন্ত ভুলেই গেছি যাদের সাথে দেখা হয় না অনেক দিন। স্কুলকে বিদায় জানানোর পড়ে অনেক কলেজ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাস করেছি ও ঘণ্টার আওয়াজ শুনেছি কিন্তু গৌর কাকার সেই ঘণ্টার আওয়াজের সাথে কারো মিল পায়নি। আজো কানে বাজে সেই ঘণ্টা। সেই গৌর কাকার ঘণ্টার আওয়াজ। নয়া দিগন্ত