গণহত্যায় নিহতদের স্মরণে রোববার রাতে এক মিনিট অন্ধকারে ‘ব্ল্যাক-আউটে’ ছিল পুরো বাংলাদেশ

পঁচিশে মার্চে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যায় নিহতদের স্মরণে রোববার রাতে এক মিনিট অন্ধকারে ‘ব্ল্যাক-আউটে’ ছিল পুরো বাংলাদেশ। এবারই প্রথম এ ধরনের কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ব্ল্যাক আউটের কারণে গতকাল রাত ৯টা থেকে ৯টা ১ মিনিট পর্যন্ত পুরো দেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এই এক মিনিট দাঁড়িয়ে দেশবাসী নীরবতা পালন করে। তবে প্রতীকী এই ব্ল্যাক আউটের সময় জরুরি স্থাপনাগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছে, কেন্দ্রীয়ভাবে বৈদ্যুতিক সংযোগ বন্ধ করা হবে না।ফলে নিজ নিজ উদ্যোগে বাতি নিভিয়ে এক মিনিট এই প্রতীকী কর্মসূচিতে যোগ দেয় দেশবাসী। বাঙালির মুক্তির আন্দোলনের শ্বাসরোধ করতে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে এ দেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের সেই অভিযানে কালরাতের প্রথম প্রহরে ঢাকায় চালানো হয় গণহত্যা। ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান। নয় মাসের যুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মদান, আড়াই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং জাতির অসাধারণ ত্যাগের বিনিময়ে ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। একাত্তরের ২৫শে মার্চ রাতে নিহতদের স্মরণে পালিত হয়েছে আরো নানা কর্মসূচি। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনও কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। গতকাল দুপুরে রাজধানীর সোহরাওয়াদী উদ্যানের শিখা চিরন্তনের সামনে ২৫শে মার্চ গণহত্যা দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত ‘রক্তাক্ত ২৫শে মার্চ : গণহত্যার ইতিবৃত্ত’ শীর্ষক আলোচনা সভা ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ৯ই ডিসেম্বরের পরিবর্তে ২৫শে মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভের জন্য সরকারের পররাষ্ট্র ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের সচিব অপরূপ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান। আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার জন্যই বঙ্গবন্ধু যে স্থানে দাঁড়িয়ে ৭ই মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন সেই স্থানে শিশু পার্ক নির্মাণ করেছিলেন। তিনি বলেন, জিয়া মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই এ হীন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। যা দেশের মানুষের কাছে এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আরো বলেন, এই ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন এবং পাকিস্তান হানাদার বাহিনী এই ঐতিহাসিক উদ্যানেই আত্মসমর্পণ করেছিল। আর ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধী এই ঐতিহাসিক উদ্যান থেকেই ভারতীয় সেনা ফিরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ঐতিহাসিক সোহরাওয়াদী উদ্যান হলো দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর শিশুরা দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস জানার জন্যই এই ঐতিহাসিক স্থানে আসবে। এদিকে ২৫শে মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস উপলক্ষে এক সেমিনারের আয়োজন করেছে জাতীয় প্রেস ক্লাব। সেমিনারে ‘২৫শে মার্চের গণহত্যা’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন জনকণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায়। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি মুহম্মদ শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে এতে প্রধান আলোচক ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির। আলোচনায় অংশ নেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. মীজানুর রহমান। মিট দ্য প্রেস ও আন্তর্জাতিক লিয়াজোঁ উপ-কমিটির আহ্বায়ক শ্যামল দত্তের সঞ্চালনায় সেমিনারে বক্তব্য রাখেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সিনিয়র সহসভাপতি সাইফুল আলম, কোষাধ্যক্ষ কার্তিক চ্যাটার্জী প্রমুখ।